মধ্যরাত : পর্ব-১৭৭

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : উমা ড্রইং রুমে এসে ডোরার সাথে আজে বাজে গল্প করতে এল আজ কাজ নেই। একটু ফুরসৎ পেয়েছে, তাই ডিজনী যাবে তার গল্প, মুখে রোচক কোন গল্প হবে। আমি বললাম, ডিজনী যাওয়ার এখনও তারিখ ফেললাম না। তার মধ্যে আবার ডিজনীর মুখ রোচক গল্প আরম্ভ করেছে। উমা বলল, গেলেত ফুরিয়ে যাবে, তার আঘে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে গল্পই যেন আরও মজা লাগে। প্রশান্ত দা কত দূরে যাওয়ার তারিখ ফেলবেন ? আমি বললাম যাবে, যাবে, অত তাড়াহুড়া করা কিসের জন্য। অমিয়, দেবতোষ, রাহাত খাঁন ওরা চলে গেলে পর ওদের সাথে আবার ওখানে মিলতে গেলে ওদের বকবকানিতে আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার যোগার হবে। আমি কথাগুলো বলে চুপ করে থাকলাম।
উমা-ডোরা কতক্ষণ কথা বলে হাসতে হাসেত কিচেনের দিকে পা বাড়াল। সুশান্ত তখন ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন। ও চিরদিনি একটু ভাল করে খেতে পারলে আর ঘুমুতে পারলে খুব খুশী। ভগবান ওকে সেই আদরের দুলাল করে রেখেছেন। সংসারের কোন বিরাট দায়িত্ব ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দেননি, বেশ আছে। চাকুরী করে, তও আবার প্রফেসারী, মেলা ছুটি-ছাটা পায়। গাল-গল্প করে, বই পড়ে, রাশি রাশি বই বুক শেলফে সাজান, ইচ্ছে হল এখানা টান মেরে পড়ল, পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে চা খেল। ফিন ফিনে একখানা ধুতী নীচে আন্ডার ওয়ার পরে পড়ে নিয়ে ফ্যান্সি পিতলে বাঁট দেওয়া ছড়ি খানা নিয়ে বিকেলের দিকে বেলুল হওয়া খেতে নদ-নদী মেঘলার পাড় দিয়ে। প্রেম করে ছাত্র জীবনের বেশি সময় কাটিয়ে দিয়েছে, কলেজের সেরা সুন্দরী ওর প্রেমের রাজ্যে আহুতি দিয়েছে। বিয়ে দিল বাবা, তাও ওর ভাগ্যে উমার মত সেরা রূপবতী, গুনবতী, ধৈর্য্যশীল, ত্যাগী, মহৎ গুনে ভূষিতা এক পরমা সুন্দরী মিলল। একে বলে ভাগ্য, তবে ওর একটা মহৎ গুন; সেটা হল ও বড় উদার, উজার।
ভগবান বেধ হয় দিল খোলা লোককে খুব পছন্দ করে। ওর মধ্যে আমি কোনদিন নীচতা, হীনতা, কার্পণতা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখিনি। আছে বেশ, খায়-দায় ঘুমায়। কেউর বিপদ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, নিজের পকেটের দুচার-পয়সা খরচ করে তার উপকার করার চেষ্টা করে। এগুনটাা ওর আমি যখন থেকে ওর সাথে আলাপ হয়েছে, তখন থেকে লক্ষ্য করেছি। বন্ধু-বান্ধবদের যখনি যার পয়সার অভাব দেখেছে নিজে না খেয়ে তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছে। মাঝে মাঝে ভাবতাম একি রকম লোক। নিজের হোষ্টেলের খরচের টাকা থেকে বন্ধুর বিপদে বন্ধুকে দিয়ে দিল। এদিকে ওর খাওয়া-দাওয়া বন্ধ, মুড়ি-চিড়ে খেয়ে, জল খেয়ে থেকেছে। আমরা হাসাহাসি করতাম, বেটা তুই রাজা হরিশ চন্দ্র। ও বলত, জানিস ভাই কারও বিপদ দেখলে মনে বড় দুঃখ লাগে। মনে হয় সকলের জন্য নিজকে বিলিয় দেই। যতি জীবনে কোনদিন কোন সময় সুযোগ আসে তবে মানুষের জন্য কিছু করবার চেষ্টা করব। জানিনা ভগবান আমাকে সে সুযোগ দেবেন কি না।
আজ সে সব কথা, কলেজ জীবনের কথা, বার বার মনে পরে। তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। ডোরা কতগুলি আগরবাতি আমার ঘরে জ্বেলে রেখে গেল। মা-কাকিমারা সন্ধ্যে হলে ধুপধুনার গন্ধ দিয়ে সন্ধ্যে বেলা আরতি দিতেন। সে কথা মনে হল। ধুপধুলার গন্ধে সন্ধ্যার সময় বড় প্রফুল্ল লাগত। কেমন যেন পবিত্র পবিত্র ভাব। বড়দি সন্ধ্যা বেলা বাড়ীর মঙ্গল কামনায় তুলসী তলায় প্রদীব জেলে প্রণাম করতেন। কোথায় সুদুর বাংলাদেশ আর এই কানাডা-মন্ট্রিল-টরেন্টো, ইউরোপ-আমেরিকা-র ভার্জিনিয়ায় শুয়ে শুয়ে আমার মনটা বাংলাদেশের কৃষ্টি-কালচার এর জন্য আমার মনে গভীর ভাবে দাগ কাটে।
(চলবে————-)
