মধ্যরাত : পর্ব-১৭০

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : ডোরা বলল, আমার বন্ধু প্রশান্ত। সুশান্ত উমা ওরা এসেছে। তারপর দোলা কচ সবই নতুন, যদিও চেনা মুখ। তবুও একদিন আমার আরও বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে একটা দিনের পার্টি করতে চাই। কচ বলল, প্রশান্ত দাদু কি তাড়াড়াতিই চলে যাবেন ? আমার বাড়ীতে একদিন পায়ের ধুলো দেবেন। বলেন, কবে আসছেন ? আমি বললাম, যেদিন আপনি বলবেন। আকাশ বলল, দাদু আপনি আমাকে তুমি বলেন; কেন আপনি বলছেন। আমি বলালাম, আচ্ছা। ডোরার বাড়ীতে খাওয়ার জন্য সামনে সপ্তাহে মত দিল আকাশ, কুসুম। আমাদের এখানে (ডোরার বাসায়)। কুসুমের ওখানে এর পরের সপ্তাহে। কিন্তু এতদিন আমার থাকার ইচ্ছে নেই। ডোরা কুসুম খুব জোরাজুড়ি করতে লাগল। আমি বললাম, আচ্ছা দেখা যাবে।
কুসুম বলল দাদু, সুশান্ত দাদু আপনারা দুই দাদুই উমাদিকে নিয়ে আমাদের ওখানে আসুন না ? আমি বললাম, তোমার ওখানে দোলা কচ আছে। আমরা এখানে বেশ আছি। সুশান্ত আমার বন্ধু, ভাইয়ের চেয়ে বেশী। ডোরা আমার ক্লাশ ফ্রেন্ড। খাই-দাই গল্প করি। দোলা-কচ তোমার কাছে থাকুক। আমি বললাম, কুসুম তোমাকে দোলা মায়ামি যাওয়ার কথা বলেছে ? কুসুম বলল বৌদি বলেছে, তবে আমি আকাশকে বলেছি, দেখি ও কি বলে।
সেদিনের মত কুসুম, আকাশ, দোলা, কচ খাওয়া-দাওয়ার পর বিদায় হল। আমি একটু শোওয়ার জন্য বিছানায় পিঠ রাখলাম। সুশান্ত উমা পাশের ঘরে থেকে শুয়ে আকাশ আর কুসুমের বিয়ের গল্প করছিল। সেই বিয়ে উপলক্ষে দোলার সাথে কচের পরিচয়, ভবিতব্যেও কি লিখ, এখন দোলা কচের সহধর্মিনী। মানুষ কোন কালে কিছু করতে পারেনা, নছিব তাকে কান ধরে উঠায় আর বসায়। আমি শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম——। মায়ামি-ডিজনী ওয়ালর্ড থেকে ফিরে এসে টরেন্টো আর থাকবনা। মন্ট্রিলে চলে যাব। কতদিন আর বন্ধু-বন্ধবদের বাড়ীতে আস্তানা গাড়া যায়।
এবার মন্ট্রিলে ফিরে গিয়ে একা একা বাড়ীতে আমাকে অবস্থান করতে হবে। আবার সেই পূর্বের জীবন। ইউনিভার্সিটি আর বাড়ী। কঙ্কোড়িয়া ইউনিভার্সিটির আমার প্রফেসার বন্ধু-বান্ধবরা জানিনা আমাকে কি চোখে দেখবে। দোলার সাথে দেবতোষ এর শালার সঙ্গে বিয়ের কথা পাকা করতে চেয়েছিল। আমি বেশী আগ্রহ দেখাইনি। দোলার সেখানে মতও ছিল না। আজ-কালকার বিংশ শতাব্দীর যুগের ছেলে-মেয়ে বিয়ে সাদী দিতে গেলে তাদের মতের উপর সবকিছু নির্ভর করে। যাক অনেক অনেক কথা, ভাবতে ভাবতে আমি একটু ঘুমিয়ে পরলাম। কে যেন পরম আদরে আমার গায়ে কম্বলটা একটু টেনে দিল। মাথার বালিশটা ঠিক করে দিল, লাইট টা অফ করে দিল। আমি যেন টের পাচ্ছি, অথচ চোখ খুলতে ইচ্ছে করছিলনা। ঘুমিয়ে থাকলাম। মা মরে যাওয়ার পর, বড়দি শ্বশুর বাড়ীতে চলে যাওয়ার পর, আর কারও ভালবাসা, ¯েœহ, মায়া-মমতা, আদর-যতœ আমি পাইনি। আজ যেন কারও একটু আদর-¯েœহ ভালবাসার আমি বড় কাঙ্গাল। ঘরের জানালাটা বোধ হয় খোলা ছিল, বন্ধ করে দেবার শব্দ আমার কানে প্রবেশ করল।
অনেক রাতে আমার তন্দ্রার আচ্ছন্নতা, আমার কেটে গেল। চোখ মেলে দেখলাম রাত ভোর হয়ে আসছে। পাখ-পাখালির কিচির-মিচির মৃদু শব্দ কানে এসে থমতে দাঁড়াল। উঠে ড্রইং রুমের বড় জানালাটার পাশে দাঁড়ালাম। প্রকান্ড কাঁচ দিয়ে ঘেরা জানালাটা দিয়ে প্রকান্ড আকাশটাকে আমি দেখতে পাই। অসংখ্য ছোট ছোট তারাগুলি স্তিমিত হয়ে আসছে, নিরব নিঝুম নিস্তব্ধ পৃথিবী। রাস্তা দিয়ে গাড়ী যাতায়াত করছে, কোথাও কোন দেশে এত গাড়ী যাওয়া আসা করছে বুঝিনা। মানুষ সব পাখির মত, আজ যে এখানে আছে কাল সে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
(চলবে———)
