মধ্যরাত : পর্ব-০৯

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : গাড়ী চালাচ্ছিল খুব আস্তে আস্তে। দুধারের পাহাড় যেন আর শেষ হয় না। নিবিড় বন সারি বাঁধা আলোর উজ্জ্বল রূপালী ফিতার মত এঁকে বেঁকে উঠা পাহাড়ের সেই পিচঢালা পথ নির্জন নিঝুম। এমেরিকার সীমানা আস্তে আস্তে পার হয়ে আসছি। সারা পথে সমুদ্র মেঘলা আটলান্টিক মহাসাগরের ঢেউয়ের উচ্ছাসের গর্জনে যেন আমার কানের কাছে বার বার ভেসে আসছে। সারা পথে আমি যেন দেখছি ডোরা কাতর নয়নে আমার পানে চেয়ে আছে।
নায়াগ্রা আর মাত্র ষাট মাইল আছে। এই কয়দিন কত সাধ ছিল, বাবসা ছিল, রাতদিন কত জ্বল্পনা কল্পনা করেছি। ফ্লোরিডা যাব, জিডনী ওয়ালর্ডে যাব। মিয়ামি যাব। সব বাসনা, সাধনা সমুদ্র মেঘলার পাড়ে ডোরার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেল। তবু গাড়ী ড্রাইভ করে নায়াগ্রা এলাম।
দূর থেকে নায়াগ্রার অপরূপ অপূর্ব, মনোহর মনোরম, অনিন্দ সুন্দর বিষ্ময় ভরা রূপ দেখে চমকে গেলাম। বার বার তাকে আমি নমস্কার করলাম। পৃথিবীর অলঙ্কারে সে ভূষিত হয়ে আছে। দেখে যেন মনে হয় সে রূপকথার রূপ কুমারী। রূপ লাবন্যে ভরা রূপের উচ্ছাসে সে মানুষের মনে মুর্চ্ছনা জাগায়। উল্কার মত জল প্রপাতের জলগুলো ছুটে ছুটে দৌড়ে দৌড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ দেশ, দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল নায়াগ্রাকে দেখার জন্য। পৃথিবীর কত সাহিত্যিক, কত কবি, কত উপন্যাসিক জানতে চেয়েছে হে নায়াগ্রা কোন মহাকালের পথে তুমি ধেয়ে ধেয়ে যাও। রাতের নায়াগ্রাকে আমার দেখার বড় সাধ ছিলো। নব বধূর মত রক্ত চেলী পরে সে বসেছিল, কপালে গালে চন্দনের আল্পনা। দুটি ঠোট রক্ত করবীর মত লাল। মায়াময় আবেগ আমি যেন তখন সেই জগতে ছিলামনা। কল্পনার জগতে আমি তার হাত ধরে সমগ্র পৃথিবীর রূপ সুধা পান করেছিলাম। আমার প্রেমের অগুনতি গভীরতা তারে আমি বলেছিলাম। কতক্ষণ যে আমি নায়াগ্রার পানে চেয়েছিলাম, আমার মনে নেই। হঠাৎ বৃষ্টি আরম্ভ হওয়ায় এ জগতে ফিরে এলাম।
দেখলাম কত দোকন-পাট কত ফুলের বাগান। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনী, জাফরানী, কত ফুলের বাহার নাম না জানা কত ফুল, ফুলের রাজ্যে মনে হয় আমি হারিয়ে যাব। কতগুলো ফুলের ছবি নিলাম। আমার যেন নায়াগ্রার কাছ থেকে আর ফিরে আসতে ইচ্ছে হচ্ছিলনা। তবু আসতে হবে, বাঁচতে হবে, কাজ করতে হবে, চাকরী স্থানে ফিরে যেতে হবে। কতক্ষণ খেলনার দোকানে ঘুরে ঘুরে বেড়ালাম। খেলার জিনিস দেখে কি হবে ? আমার সংসার নেই, কেউ নেই, কিছু নেই। ছোট ছোট বাচ্চাদের দেখে খুব ভালো লাগল। কচি কচি মুখ, ছোট ছোট খেলনা হাতে পুতুলটা কি সুন্দর করে বুকের মাঝে জড়িয়ে রেখেছে। মায়ের মুখে মাতৃত্বের গর্ব ফুটে উঠেছে। অনেক রাত হল ঘুরে ঘুরে যেন ক্লান্ত বোধ করছিলাম। আকাশের বড় চাঁদটা নায়াগ্রা জল প্রপাতের ওপারে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে যেন ঝিমুচ্ছে। আধো আলো আধো ছায়া এই লুকুচুরির মাঝে অসংখ্য তারা ঝিকঝিক করছে। ডেকোরেশন লাইটের আলোয় যেন মনে হয় কোন স্বপ্নপুরীর স্বপ্নলোকে আমি অবস্থান করছি।
(চলবে———)
