বদলে গেছে ভোলার ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর চিরচেনা দৃশ্যপট

১ জুলাই থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহের ঘোষিত সারাদেশের কঠোর লকডাউনে উপকূলীয় দ্বীপ জেলা ভোলায়ও তৎপর ছিল প্রশাসন। শুক্রবার সকালেও ভোলা সদর রোড, যুগিরঘোল, মহাজপট্টি, চকবাজার ও কাচাবাজারের খালপাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় নির্বাহি ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালতের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদেরকে মাঠে তৎপর থাকতে দেখা গেছে।

জরুরী প্রয়োজনে কয়েকটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও এম্বুল্যান্স ছাড়া আর কোন যানবাহনকে ভোলা শহরে চলতে দেখা যায়নি। শহরের সব দোকানপাট বন্ধ ছিল।
তবে, লকডাউনের আগের ভোলা শহরের চিরচেনা শুক্রবারের দৃশ্যপট যেন এবার অনেকটাই বদলে গেছে।
কারন, লকডাউনের আগে প্রতি শুক্রবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোলা সদর উপজেলার বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে প্রচুর রোগীদের ভিড় থাকতো। সেসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে সারি সারি এম্বুল্যান্স, মাইক্রোবাস ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন রাস্তায় অপেক্ষারত থাকতো। এমনকি ওই অবস্থায় তখন সদর রোডে যানজটের সৃষ্টি হতো। ওই দিন রাজধানী ঢাকা ও বরিশাল থেকে বিভিন্ন হাসপাতালের বড় বড় ডিগ্রীধারী ডাক্তাররা উপকূলীয় এ দ্বীপ জেলা ভোলার বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসে রোগী দেখতেন। রোগীদের চিকিৎসায় রোগ শনাক্ত করার জন্য ডাক্তাররা রোগীদেরকে বিভিন্ন টেষ্ট দিতেন। তখন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো থাকতো জমজমাট। ডাক্তার ও রোগীদের যেন সাপ্তাহিক হাট বসতো।
কিন্তু বর্তমানে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ঘোষিত কঠোর লকডাউনের প্রভাবে শুক্রবার সেই চিরচেনা দৃশ্যপট যেন বদলে গেছে। শুক্রবার সেই চিত্র আর দেখা যায়নি। দেখা গেছে উল্টো চিত্র। শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েকটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে নেই শত শত রোগীদের ভিড়। অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ছিল হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। তারা ভোলা সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এসেছেন। এবং ভোলা সদর হাসপাতালে কর্তব্যরত ডাক্তারদের দেখাতে এসেছেন। কয়েকজন রোগী অন্য উপজেলা থেকে আসলেও পথে পথে পুলিশের বাঁধা ও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে রাস্তায় দেখা যায়নি এম্বুলেন্স কিংবা অন্য কোন যানবাহনের জট। প্রায় রোগীশূন্য ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বলছেন, লকডাউনের আগে প্রতি শুক্রবার যেখানে ভোলা শহরের ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসতো, সেখানে গত শুক্রবার অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ছিল রোগী শুন্য।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে ভোলা সদর উপজেলার সদর রোড এলাকার ভোলা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দেখা গেছে প্রায় রোগী শূন্য ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা অনেকটাই যেন অলস সময় কাটাচ্ছেন। জানতে চাওয়া হলে অভ্যর্থনা কক্ষের দায়িত্বরত মোঃ জিয়াউর রহমান ভোলার বাণীকে জানান, লকডাউনের কারনে গত শুক্রবার ঢাকা ও বরিশালের কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আসেননি। তাই রোগীও নেই। এতে ভোলা জেলার সাত উপজেলা থেকে অনেক গুরুতর অসুস্থ রোগী ভোলা সদরে চিকিৎসা করাতে আসতে পারেননি। তিনি বলেন, লকডাউনে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যানবাহন বন্ধ থাকায় জেলার দক্ষিণে বিভিন্ন উপজেলার রোগীরা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসতে পারেননি। সকাল থেকে গুরুতর অসুস্থ রোগীসহ অন্ততঃ ৪০ জন রোগী আমাদের কাছে ফোন করে ডাক্তারের খোঁজ নেন। তাদেরকে ডাক্তারের ফোন নম্বর দিয়ে দিয়েছি। এর মধ্যে অধিকাংশ রোগীই গাইনী ডাক্তারকে দেখানোর কথা ছিল।

আলিফ ক্লিনিকের ম্যানেজার ফিরোজ আলম (চুন্নু) জানান, লকডাউনে যানবাহন বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন ঢাকা-বরিশালের ডাক্তাররা আসতে পারেননি। অন্যদিকে, একই কারনে রোগীরাও এখন আর ঘর থেকে বের হতে চাচ্ছেন না। তাই, এ দিন মাত্র ২ জন রোগী এসেছেন। অথচ লকডাউনের আগে গত শুক্রবার এ ক্লিনিকে রোগী ছিল অন্ততঃ ২৫ জন।

মেডিফাস্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আকতার হোসেন বলেন, লকডাউনের আগের শুক্রবার এ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ছিল ১০২ জন। আর লকডাউনে এ শুক্রবারে সকাল সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত রোগী মাত্র ৬ জন। তিনি বলেন, সকাল থেকে ৭০-৮০ জন রোগী ফোন করে ঢাকা-বরিশাল থেকে ডাক্তার আসছেন কিনা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ডাক্তাররা না আসায় রোগীরাও আসেননি। ঢাকা থেকে ২ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসেন।

তিনি আরও বলেন, মাস শেষে ডায়গনোস্টিক সেন্টারের ভাড়া পরশোধ করতে হয়। আবার স্টাফদের বেতন দিতে হয়। তাই, এভাবে লকডাউন দীর্ঘদিন চললে এবং রোগীরা না আসলে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

এদিকে, ভোলা সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এবং অন্য উপজেলা থেকে রোগীদের ভোলা সদর উপজেলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে আসতে পথে পথে পুলিশের বাঁধা ও বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

ভোলা সদর উপজেলার ভেলুমিয়া এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় উঠে সকিনা বেগমকে নিয়ে আসছেন তার পুত্রবধূ জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বলেন, তার শাশুড়িকে নিয়ে আসছেন আলিফ ক্লিনিকে গাইনী ডাক্তার পারভীন বেগমকে দেখাবেন বলে। কিন্তু, পথে পুলিশ প্রথমে তাদেরকে বাঁধা দেয়। পরে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র দেখানোর পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের অটোরিকশা চালক মোঃ নুরুদ্দিন বলেন, তিনি বোরহানউদ্দিন থেকে ভোলায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসছেন রোগী নিয়ে। পথে পথে বোরহানউদ্দিন বাসস্ট্যান্ড, বাংলাবাজার, ভোলা বাসস্ট্যান্ড, যুগিরঘোল ও শহরের বাংলাস্কুল মোড়ে পুলিশের বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন। ওই সব জায়গায় পুলিশকে ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে ভোলা সদরে আসতে হয়েছে। এতে করে ৩৩ মিনিটের পথ দেড় ঘন্টায় আসতে হয়েছে।

এ ব্যাপারে ভোলা সদর মডেল থানার ওসি মোঃ এনায়েত হোসেন জানান, সরকারের ঘোষিত লকডাউন বাস্তবায়নে পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া কাউকে রাস্তায় বের হতে দেওয়া হচ্ছেনা। সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে। তবে, রোগী বা তাদের যানবাহন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ভোলা জেলা ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সভাপতি ও এ্যাপোলো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সত্বাধিকারী মোঃ জাহিদুল হক শুভ শুক্রবার বিকেলে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো খোলা রাখতে বলা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো কিভাবে চলবে তার কোন সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। দূর দূরান্ত থেকে রোগীরা আসলে তাদেরকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ভোলা শহরে প্রায় ৩০ টির মতো ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। যার বেশীরভাগই ভাড়ায় চলছে। লকডাউনে দূর দূরান্ত থেকে রোগী না আসতে পারায় ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ঘর ভাড়া, স্টাফদের বেতন ও বিদ্যুৎ বিলসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। লকডাউন দীর্ঘদিন চলতে থাকলে এ ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা সেবাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করেছেন তিনি।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।