শতাব্দীর মহানায়ক অনন্য মুজিব : পর্ব-১২

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

 (গত পর্বের পর) : ১৯৬৮ সালে আমার স্বামী অবসর গ্রহণ করে ঢাকায় এলেন। আমার ছেলের বাসায় বেইলি রোডে থেকে আমি একটি ছোট খাট মহিলা সমিতি গঠন করে কাজের বুয়াদের ছেলেদের পড়াশুনার ভার গ্রহণ করি। ৩০ জন মহিলা মেম্বার সমিতিতে যোগদান করেছিল। গরীব, এতিম বাচ্চারা পড়াশুনার স্বাদ পেয়ে খুশিতে মেতে উঠল।
১৯৫১ সালে ইস্ট পাকিস্তান ওয়েস্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পরাধীনতা শৃঙ্খল মুক্ত হাবার স্বাধীনতার স্বপ্নে জেগে উঠল। আন্দোলন প্রসেশন মিটিং চলল। শ্রমিক, মজুর, কৃষক, সাধারণ মানুষের ঢল এগিয়ে আসল। বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, উপন্যাসিক এগিয়ে এল। তাদের দাবি ১২ আনা সম্পদ চলে যাচ্ছে ওয়েস্ট পাকিস্তানে, ওরা আমাদের চুষে চুষে খাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু এলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের জয়ের পতাকা হাতে নিয়ে। সে পতাকা ছিল আমাদের আশা-আকাঙ্খার দৃঢ় প্রত্যয়ের এক জলন্ত রক্ত লাল স্বাধীনতার উজ্জল সূর্য শিখা। তার এক অঙ্গুলি হেলনে বাংলাদেশের লাখো লাখো লোক জেগে উঠল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিলেন কোটি কোটি জনতার উদ্দেশ্যে। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম। যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা কর। সমগ্র দেশ সুপ্ত ঘুমের ঘোর থেকৈ জেগে উঠল। জেগে উঠল পথ হারা, দিশে হারা, ঘর ছাড়া, বাড়ি ছাড়া, সাধারণ মানুষ। পেল পথের দিশা। দিন মজুর, খেটে খাওয়া লোক বুঝল দাবীর অধিকার আদায় করে নেবার শপথ।
আমি একদিন ভীরু হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করলাম। বঙ্গবন্ধু বোধহয় সাজেদা চৌধুরীর কাছে আমার কথা শুনে থাকবেন। আমার বাবার পরিচয় দিলাম, সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেললেন তিনি। আপনি খান বাহাদুর নূরুজ্জামান সাহেবের মেয়ে ? আপনার ভাই মোমেন আমার সাথে রাজনীতি করতেন, সে কথাও বললেন। আরও বললেন, শুনলাম আপনি একজন ক্যাপ্টেন, মেয়েদের একটু ট্রেনিং দিন। প্রায় ১০০ মেয়েকে ইন্দিরা রোডে, মরিচা হাউজে, সাজেদা চৌধুরীর বাড়ীতে প্রায় মাস খানেক ট্রেনিং দিয়েছিলাম থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে। এগুলো মেয়েদেরকে শুনিয়েছি অর্গানাইজ করছে সাহারা খাতুন। এখন সে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির জেনারেল সেক্রেটারী।
সাজেদা চৌধুরীর অনুপ্রেরণার কথা আমার মনে আছে। তিনি আমাকে খুব ভালবাসতেন, আমিও তাকে ছোট বোনের মত ¯েœহ করতাম। তখন রাস্তায় এত বড় বড় ট্রাকের প্রচলন ছিল না। এত গাড়িও ছিল না, এত রিক্সা, এত রকম যানবাহনের প্রচলন চিল না। আমি রিক্সা করেই নিজ খরচে ইন্দিরা রোডে মরিচা হাউজে যাতায়াত করতাম। বঙ্গবন্ধুর কথায় আনন্দে, উৎসাহে উদ্দীপনায় জীবনযুদ্ধের তরুণী হয়ে উঠেছিলাম। চোখ ছিল আমার বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন, জীবন যুদ্ধে আমিও তখন ছিলাম একজন নবীন সৈনিক। সংসার, বাড়ী, ঘর ছেড়ে আত্মহুতি দিলাম নবীনতার স্বপ্নে।
চারদিকে সাড়া পড়ে গেল চিটাগাং বন্দর নগরীতে শিপে করে পাকিস্তান্তি সোলজার নেমেছে। অতি সত্ত্বও ঢাকা মহানগর রণভূমিতে পরিণত হবে। অনেক লোক বিশ্বাস করে গ্রামে-গঞ্জে পাড়ি জমাল। আমার স্বামীও আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভোলায় পাড়ি জমাল। আমি বঙ্গবন্ধুর আদেশকে শ্রদ্ধা করে আমার কোলের মেয়েটিকে নিয়ে পরীবাগে থেকে গেলাম। রোজ ৪টায় ইন্দিরা রোডে যেতাম। ৫টা-৬টায় রাইফেল ট্রেনিং দিয়ে বাসায় ফিরাতম। এমনি করে মাস খানেক না আরও বেশি পরে আজ আমার তত মনে নেই ২৩ শে মার্চে অর্ডার পেলাম ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে রাইফেল দিয়ে গার্ড অব অনার দিতে হবে বিকাল ৫ ঘটিকায়।

(চলবে——)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।