জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৮৬

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন):
(গত পর্বের পর) : আমার বিবাহ : পৃথিবীর সব কিছুই বিধাতার নির্দেশে হয়। আবার কিছু কিছু বিষয় চেষ্টা ও ভাগ্যের সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু বিয়ে ও মৃত্যু মহান আল্লাহর প্রত্যক্ষ নির্দেশে হয়ে থাকে। আমার বিয়ে ঠিক আমি বুঝে উঠতে পরিনি। আমার যখন বিয়ে হয়, তখন ১৯৩৫ সাল। বাঙলা চৈত্র মাস। তখন আমার বয়স মাত্র ১২ বছর। সে দিন কি বার ছিল আজ আর আমার জানা নেই। অনেক ছেলের সাথে আমার ও আমার ছোট বোনের বিয়ের প্রস্তাব আসে। বাবা প্রায় প্রস্তাবই নাকচ করে দিয়ে আমার স্বামীকে পছন্দ করেন। তখন তিনি সুন্দর সুদর্শন ও স্বাস্থ্যবান ছিলেন। উনি ফিলোসফিতে এম.এ পাস, বয়স পঁচিশ হবে।
বিয়ের সম্বন্ধে আমার তখন কোন জ্ঞানই জন্মে নি। দেখলাম বাড়ী ঘর খুব সুন্দর করে সাজানো। অনেক মিষ্টি মিষ্টান্ন অর্ডার করা হয়েছে। আমার নানা, মামা পুকুর থেকে অনেক বড় বড় রুই কাতলা ধরার ব্যবস্থা করেছেন। বড় বড় দু’টো খাসি নিয়ে এসেছেন। নাতনীর বিয়ে তো। আমার কাকা আমার বড় জ্যাঠা মনি এলেন না। বললেন, ছেলের ফ্যামিলি ভাল না। এ বিয়েতে তাদের কোন মত নেই।
আমি আমার বড় ভাইয়ের সাথে কি নিয়ে যেন খুব ঝগড়া করেছিলাম। আমার মামা বললেন, এই তবু, তোর না আজ বিয়ে ? বিয়ের দিনে ঝগড়া করতে নেই। মা দেখলাম অনেক কাঁচা হলুদ, মেহেদি বেটে পাড়ার সব খালাম্মাদের ডেকে পাঠালেন। কিন্তু আমি কোন আনন্দ, সুখ, শিহরন, রোমাঞ্চ বলতে কিছুই অনুভব করতে পারি নাই। সকলেই এসে আমাকে একখানা সুন্দর চেয়ারে বসিয়ে হলুদ, মেহেদী মাখালেন। আমি অবাক নয়নে ফ্যাল ফ্যাল করে দেখলাম। বিকালের দিকে বাসায় রান্না পোলাও, কেরমা, জরদা, ফিরনি রান্নার সুগন্ধ বাড়ীতে সুবাস ছড়িয়ে পড়ল।
বৈঠক খানার ফরাস সতরঞ্জি সুজনী দিয়ে সমস্ত ঘর সাদা ফরাসে ডেকে দিয়ে গদি বালিশ বড় বড় সিল্কের কাপড় দিয়ে কুঁচি লাগানো পাখা হাতে কাজের ছেলেরা দাঁড়িয়ে গেল। মা লোহার সিন্দুক থেকে দামী দামী গহনা নিয়ে এসে একটি রূপার পানদানে রেখে আমাকে সাজাতে লাগলেন। আমার ছোট বোন আশু, তারও ঐ দিনই বিয়ে হবে শুনলাম। ছেলে আই.এ পাশ। আমার বাবাই তাকে এম.এ কিংবা তার উপওে পড়তে চাইলে পড়াবে। ওকেও মা অমনি করে হলুদ, মেহেদী পড়িয়ে সুন্দর দামী দামী অলংকার পড়ানেল। ওর বয়স তখন ১১ বছর। কত লোকের আনাগোনা, কত মিষ্টি গুড়ের ছড়াছড়ি, কত বাজি, তরুমি, হাওয়াই আকাশে উড়ছিল ফুল হয়ে অনন্ত লোকে মিলিয়ে গিল। হুলস্থুল কান্ড-কারখানা।
আমার বাবা কত নাম। খান বাহাদুর সাহেব টাকার নাও পাহাড়ের উপর দিয়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। জয় জয়কার ধন্য খান বাহাদুর নুরুজ্জামান। লোকের মুখে তাঁর নাম অনেক হাসি আর আনন্দেও পরশ শোনা যাচ্ছে। যার বিয়ে পড়ান হলো বা যাদের কাছে আমার বাবা বিয়ে দিলেন তাদের মনের গতি বা প্রাণের অনুভূতির খবর কি তা আমার বাবা মা কেউ চিন্তা করল না। খোঁজও নিল না। রাত কয়টায় আমাদের দু-বোনের বিয়ে হয়েছিল তা আজ আমি বলতে পারব না। আমরা দু’জনই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে গেজেই শুনলাম কাল রাতে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি ছোট ছিলাম বলে বাবা আমার স্বামীর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতে দেননি।
আমি বড় হলে তার সাথে আমার রোসমত হবে। তখন আরো অনেক বড় ধুম ধাম হবে, হাওয়াই, তুরমি আকাশে উড়বে। বাজি পুড়বে, লোকজন খাবে, আরো আরো কত কি কথা। কিন্তু এসব চিন্তা করার মন মানসিকতা তখন আমার তৈরী হয়নি। রাতে না কি আমার স্বামী আচকান পাগড়ী পড়ে নাগরাই জুতা পায়ে দিয়ে তার আত্মীয়-স্বজন নিয়ে খুব ঝাঁক-ঝমকের সাথে এসেছিলেন। খুব হাঁসি-খুশি উচ্ছল, প্রাণবন্ত যুবক। আমি যেন কিংবদন্তির রাজপুত্রের পল্পের মত সকলের মুখে মুখে এসব শুনেছিলাম। তার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। সে এল কি গেল সে জন্য আমার কোন মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু বাড়ীর সকলের আমার মা-বাবার আগ্রহ ও অস্থিরতা যেন বেড়েই চলছে।
(চলবে————)
