ভোটের সময় অনেকেই আসবে, যোগ্য প্রার্থী বেছে নিন” — ভোটারদের উদ্দেশ্যে শামসুদ্দিন মাতাব্বর
জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৭৩

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : সব বীজ যদি অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায় তার আর বলার কিছু থাকে না। ছেলে আর মেয়েটাকে নিয়ে তাদের চেষ্টা, পরিশ্রমের শেষ নেই। মাস যায়, … বছর যায় … এক যুগও বোধহয় গেল। কত কথা, কত স্মৃতি, কত স্বাধ, সব যেন আল্লাহ বিফলে নিয়ে গেলেন। একদিন দেখা গেল জরিন নিজেই ক্লান্ত, ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শয্যা নিল। কত আশা সাধ জরিনের বেচেঁ থাকার। ক্যান্সার শুনে টরেন্টোর বন্ধু-বান্ধবীদের নানা রকম সুখাদ্য রান্না করে পিকনিক-এর আয়োজন করে খাইয়ে দিল। অনেকেই প্রবল আপত্তি তুলল, না, না আপনার শরীর খারাপ। কি প্রয়োজন খাবার দাবার, আমরা এমনিতে খুশি আছি।
জরিন বলল, আমার অসুখের কথা শুনেছ? আমি এত ঘাবড়াবার মানুষ নই। রোগ আল্লাহ দিয়েছেন বেঁচে থাকার এবং মেরে ফেলার তিনিই মালিক। দু’টো বছর ভুগে ভুগে টরেন্টে জেনারেল হাসপাতালে জরিন দিন দিন পাট কাঠির মত হয়ে গেল। তবুও বিজনকে আশ^াস দিয়ে অভয় দিয়ে সান্তনা দিয়ে বুঝ দিয়ে ছেলে মেয়ে দু’টোকে সামনে রেখে মনোবল এনে দিয়েছে। কখনো যেন বিজন ভেঙ্গে না পড়ে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। নিজের হাজারো যন্ত্রনা বিজনকে বুঝতে দেয়নি। পিছনের যৌবনের রঙ্গিন স্বপ্নে বিজনকে সব সময় রাঙ্গিয়ে রাখত।
পবিত্র আল-কুরআনের বাণী কুলু নাফসিন জায়েকাতুল মাউত, (প্রত্যেক প্রাণীই মরনশীল) একদিন মরন এসে জরিনের শিয়রে দাঁড়াল তাকে নিয়ে যাবার জন্য বিকেলে দুপুরে, সকালে সব সময় “বিজন” কখন অনিরুদ্ধ অনিতাকে নিয়ে কখনো একা জরিনের রোগ ক্লান্ত শিয়রে দাঁড়াত। আজ বিকেলে এসে ছিল জরিন কাপা কাপা হাতখানা তুলে বিজনেকে স্পর্শ করে বলেছিল, দেখ আমি অতি তাড়া তাড়ি সুস্থ হয়ে উঠব। তুমি ভেবনা বিজন দুঃখের হাসি হেসে ছিল।
মনে মনে বলল, হায়রে জরিন তুমি চলে যাচ্ছে আমি দেখছি। তবুও আমায় তুমি মিথ্যে সাত্বনা দিচ্ছ। জরিন বিছানার সাথে একদম মিশে গেছে জীর্ণ শীর্ন হাত খানা দিয়ে মাঝে মধ্যে বিজনকে স্পর্শ করে বলত, আমি শিঘ্রই সেরে উঠব। বিজনের ঠোঁটে অবিশ^াসের মৃদ হাসি চোখে জল। সে দিন সন্ধায় ও মেয়েটা ভাল আছে জানাল। কমলার কোস খুলে মুখে দিল, আঙ্গুর ছিড়ে জরিনক খাইয়ে দিল। শেষ রাতের দিকে সিষ্টার দেখতে এসে দেখতে পেল জরিন শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করে এ পৃথিবীর অনেক উর্ধ্বে চলে গেছে। সিষ্টার বিজনকে ফোন করে জানাল, বিজন হতভম্বের মত শুনল। জানত জরিন চলে যাবে। তাকে আর ধরে রাখা যাবে না। এ রোগ থেকে মানুষের মুক্তি নেই।
তবুও যদি বেঁচে ওঠে এই ক্ষীণ আশাটুকু তাকে জিইয়ে রেখেছিল। বিজন কাঁদল না। কত কান্না তার বুকে পাথর হয়ে চেপে বসে আছে। কত নিশুতি রাতে আকাশের চাদের দিকে চেয়ে পাহাড়ের নির্জনতার দিকে চেয়ে বুক তার হাহাকার করে এত নির্জন কেন? এ পাহাড় এত উচ্ছল কেন? এ সমুদ্র এই ওসাগা নিরব কেন?
কত মন দেওয়া নেওয়ার পালা চলত জরিনের সাথে ওসাগার উদ্দমতার মাঝে। অনিতা ও তেমনি কিছু বোঝে না আল্লাহ তাকে বুঝবার তমত মাথায় কিছুই দেয়নি। অবুঝ অনুরুদ্ধ বুঝবার মত ওর জ্ঞান হয় নি। অনিতার এক খালা বোনকে দেখা শুনা করত। এক মামা ছিল দূর সম্পর্কের তারাই ডেড বডি বাংলদেশে নিয়ে গেল। আর এখানে টরেন্টের বন্ধু বান্ধবরা ভেঙ্গে পড়ল সহানুভুতি সমবেদনা জানাবার জন্য।
প্রচলন অনুযায়ী মৃত্যুর তিন দিন পর কুলখানিও করল প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবরা। প্রত্যেক বাড়ী বাড়ী থেকে রান্ন-বান্না করে পাঠাল অন্তরঙ্গতা ও আন্তরকিতার কোন ত্রুটি ছিল না।
কিন্তু বিজনের মনে কিছুই না পাওয়ার বেদনার আগুন ধূ ধূ করে জ¦লে উঠল। ভেবেছিল জরিন সারা জীবন কাছে থেকে প্রেম-ভালবাসা, সোহাগ, আদর, অভয় দিয়ে, সান্তনার বাণী দিয়ে তাকে ঘিরে রাখবে। ছেলে-মেয়েটাও তাকে সুখ শান্তি দিতে পারল না।
তারপর জরিনও তাকে ছেড়ে চলে গেল, তারপর হে প্রভু তুমি আর কতদূর কত বছর… বল? উলে ছেঠলে ও মেয়েটা কখন কোন যে কোথয় চলে গেল কাকেও বলে গেল না। অনিতার খালা, মামা, বন্ধুরা শুনল বিজন নিরুদ্দেশ … নিরুদ্দেশ … কোথায়? কোথায়, এমেরিকা? কানাডা? নিউ ইয়র্ক? না, বাংলাদেশে-
গান-
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু
আনলে পুড়িয়া গেল।
(চলবে—————-)
