সর্বশেষঃ

জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৭২

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত পর্বের পর) : ওয়াসাগা সমুদ্র লেক, জরিন ও বিজন : স্ত্রী মারা যাবার পর বিজন ছেলেমেয়ে দু’টোকে নিয়ে কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হলেন। কোথায় গেলেন, ক’দিনের জন্য গেলেন, কবে ফিরবেন, আর ওসাগাতে ফিরবেন কিনা তাও বলে গেলেন না। সকলেই শুনল বিজন, অনিতা, সুনীলকে কোথায় যেন একটু নিঃশ্বাস ফেলতে গেল।
আর লোকটার দোষই বা দেই কি করে, বল? সেই যে জরিন ঢাকা ভার্সিটিতে লেখাাপড়া করার সময়ে দেখে ভাল লেগেছিল, মন অগোচরে ভালো বেসেছিল। সে কথা বন্ধুবান্ধাব, কাকেও মনের ভুলে জানতে দেন নি। এমন কি মা বাবাকেও না। তারপর ভার্সিটির এক অনুষ্ঠানে জরিন রবী ঠাকুরের পুঁজারিণী নৃত্যনাট্যে পূজারিনীর অংশে অভিনয় নৃত্যে নৃত্যনাট্য নাচ নেচেছিল। সেদিন যেন বিজন মন্ত্র মুগ্ধের মত জরিনকে তার আরো … আরো ভালো লেগেছিল। তারপর সে জরিনকে পাবার জন্য উন্মুখ হয়ে উঠছিল।
তারপর বিজন চাকরী নিয়ে নর্থ অন্টরিউ ভার্সিটিতে চলে আসে। দিন, বছর, সময় পেরিয়ে যায়। বিজন মাঝে মধ্যে দেশে যায়। শুনলো জরিন ডাকা ভার্সিটিতে এম.এসসিতে ফাস্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছে। একটা স্কলার শিপ পেল ম্যাাগগিল ভার্সিটিতে। জরিনের বাবা নেই মা বিধাব। অনেকগুলো ভাইবোন নিয়ে সংসার সংগ্রামে বিব্রত। তবুও বিজন মনে সাহস নিয়ে জরিনের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাল। জরিন মায়ের কাছ তার কথা জানাল। মা এ প্রস্তাব অতি সহজেই মেনে নিল। তারপর একদিন তাদের ঢাকার বাড়ীতে বিয়ের ডামাডোল বেজে উঠল। তখন বিজন ওসাগাতে চাকুরী করত। বিয়ের পরপরই জরিনকে নিয়ে এল ওসাগাতে। নির্জন সমুদ্রের উচ্ছাস, আর বাঁধভাঙ্গা তাদের যৌবনের উচ্ছাস বুঝি এরকমই উদ্দাম উত্তর তরঙ্গমালার মত ছিল। এক দিকে ডেউ খেলানো পাহাড়ের দৃঢ় বাঁধন কালো মেঘের মত ছেয়ে আছে। আর একদিকে ছল ছল কল কল উদ্দাম গতিতে জল গুলো নেচে নেচে ধেয়ে আসছে। ওহ সেকি গর্জন। সমুদ্র নিজের গর্জন যদি কানে শুনত তাহলে বোধহয় সে এত গর্জন করে নিজের শান্তি বা অন্যের শান্তি ভঙ্গ করত না।
জরিন তখন ম্যাগগিলে পড়ছিলো, দু’বছরেই এমএসএস শেষ হলো। এর মাঝেই অনিতা এলো। সুন্দর তাদের মত টুকটুকে দেখতে। তাকেই ঘিরে চলছিলো তাদের জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু দেখা গেল অনিতা যতই বড় হচ্ছে ততই বিকলাঙ্গের রূপরেখা প্রতিফলিত হচ্ছে। তবুও বিজন জরিন স্বপ্ন দেখে সুন্দর একখানা সংসার গড়ার। অনিতা প্রায়ই চোখ বড় বড় করে ফিট হয়ে যায়। খাওয়া, দাওয়া ছেড়ে বিজন, জরিন ডাক্তার হাসপাতালে ছুটাছুটি করে। বড় বড় ডাক্তার মন্ট্রিল, টরেন্টো, ওসাগা এসব নগরীর সুচিকিৎসায়ও অনিতাকে সুস্থতার দিকে তেমন কোন উন্নতির আশা দেখা যায় না।
অনিতা দিন দিন বড় হতে থাকে। দেখা যায় অনিতা দুল দুল করে হাঁটে। আর কি কথা বলে তা কেউ অবলোকন করতে পারে না। জরিন তা বন্ধু বান্ধবীকে বুঝিয়ে তুষ্টি করে। এরই মাঝে অনিতার একটি ভাই এলো অনিরুদ্ধ। এনে বসিয়ে দিয়েছে। ছেলেটাকে দেখে সুস্থ সবল বলে মনে হয়। অদূর ভবিষ্যতে জ্ঞানী হবে বললে বোধহয় ভুল হবে না।
জরিনের অনেক গুণ ছিল- ভাল নাচ, গান, ভাল পড়াশুনায় শেষ পর্যন্ত এম.এস,এস, করে আর এগুতে পারেনি। মন্ট্রিল ম্যাগগিল থেকে টরনেডো ওসাগাতে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখানে রান্নায় যথেষ্ট সুনাম অর্জন করে সে। এত ভাল চাইনিজ পাকাতে পারত। যা কেউ একবার খেলে চায়নিজ রেস্টুরেন্টগুলো হার মেনে যাবে।
অদ্ভুত মিষ্টি মধুর ¯িœগ্ধ আলাপ। অনিতা এখনও কথা যে কি বলে, বুঝা মুশকিল। প্রায় নয়-দশ বছর বয়স হবে। তা কেউ উপলব্ধি করতে পারে নি। কিন্তু জরিন এমন সুন্দর করে আমাদের বঝিয়ে বিবেন আপনারা বিস্মিত হয়ে জরিনের বা অনিতার মায়ের মুখের দিকে অপলক নয়নে চেয়ে থাকবেন।
জীবনকে জরিন প্রেম ভালবাসা, মায়া-মমতায় এ সংসারে ছায়া দিয়ে মায়া দিয়ে সোহাগ দিয়ে আদর আপ্যায়নে বেষ্টিত করে রেখেছিল। কিন্তু একদিন দেখা গেল ছোট ছেলেটা হাফানীতে আক্রান্ত। কিছুদিন বিজন ছেলেটাকে নিয়ে টরেন্টোয় জেনারেল হাসপাতালে ছিলো। সবই ভাগ্যের লিখন, মানুষ কত সাধ করে বীজ বোনে ভবিষ্যতের আশায়।

 

(চলবে——-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।