জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৬৮

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত সংখ্যার পর) : নীলাম্বরী : (মালয়েশিয়া-কুয়ালালামপুর), গ্যাংটিনে কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়ায় গিয়ে হোটেল ফরচুনা উঠেছিলাম। বিকেল তখন ৩টা হবে, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গাড়ী করে শহর দেখতে বেরুলাম। হাইকোর্ট, মালয়েশিয়া রাজার বাড়ী, আমেরিকার মত টুইন টাওয়ার দেখে বিস্ময় বোধ করলাম। বিভিন্ন পার্কে গেলাম, কত ফুলের সমারোহ দেখে ভাল লাগল। রাজার বাড়ী দেখে আশ্চর্য হবারই কথা, গেটে বাহারি ফুলের কাজ করা প্রাচীর দেখে। যে শিল্পী এটা করেছে তাকে প্রসংসা না করে পারলাম না। কত ঐশ্বর্য থাকলে মানুষ এত কারুকার্য সম্বলিত বাড়ী তৈরী করতে পারে। মালয়েশিয়ার ধনসম্পদ অনেক শুনেছি। সেখানে তেলের খনি ও সোনার খনি আছে। সাথে ছিল দুই ছেলে ও বৌমা। তাদের আনন্দ আর ধরে না। এদের কোন চিন্তা নেই। বারবার হেসে কুটি কুটি হচ্ছে। কারণ হাসে অকারণেও হাসে। আমি যেন আচ্ছন্নের মত কি খুঁজছিলাম। আমার হারিয়ে যাওয়া অতীতকে খুঁজে বার বার ব্যথিত হচ্ছিলাম। তখন আমি বাগেরহাট দৌলতপুর কলেজের বি.এ সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী ছিলাম।
সুদিন আমারই ক্লাস ফ্রেন্ড ও হিন্দু ব্রাহ্মণ। দীর্ঘ ৭ বছর পূর্বে ও বেড়াতে এসেছিল এই কুয়ালালামপুরে গ্যাংটিনে। পাহাড়ে ওর সাথে আমার দেখা হয়। দেখলাম চুলে পাক ধরেছে সুন্দর, অনুপম মুখখানা, হরিণ নয়না চোখ, মিষ্টি মধুর হাঁসি ফুটে উঠছে তার চেহারায়। হোটেলে নাস্তা খেতে ওর সাথে আমার দেখা। আমি এক টেবিলে বসে আমার মেয়ের সাথে বারগার খাচ্ছিলাম। সুদিন অন্য টেবিলে বলে নাস্তা খাচ্ছিল। প্রথম সুদিন আমাকে দেখে একটু চমকে উঠল, বললো, তুমি ? এখানে কি করে এলে ? আমি আমার মেয়েকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম। সুদিন বলল, কেমন আছ ? আমি বললাম, আছ নয়, আছেন। সুদিন হেসে ফেলল, ওহ। দুঃখিত, বেশ আছ ছেলে-মেয়ে নিয়ে। আমি বললাম, কেন ? তুমি বিয়ে কর নি ? সুদিন বলল, তোমার কি মনে হয় ? আমি আবারও বললাম, আপনি। সুদিন খুব হাসতে লাগল, ক্লাসফ্রেন্ড তুমি এখন শুধরে নিতে সময় লাগবে। আমি বললাম, তোমার বাবা-মা, বৌদি ওরা কেমন আছেন ? সুদিন বললেন, বাবা অনেক দিন আগেই গত হয়েছেন। মা-ও নেই। সুধা ?
বলল, দুঃখের কথা সুধা বিধাব হয়ে এখন দু’ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমার কাছেই আছে। মাঝে মধ্যে কলেজের মেয়েরা সবাই মিলে ওদের বাসায় কদবেল খেতে যেতাম। ওর বৌদির হাতের তেঁতুলের আচার যা মজা। সুদিন খুব সহজ প্রকৃতির মানুষ। নীলাকে সুদিন ভাল বেসেছিল। নীলার রূপ ও স্তন ছিল চমৎকার। যে কোন ছেলেই ওকে ভালবাসতে পারে। কিন্তু সুদিনই সুধাকে আঁকড়ে ধরেছিল। করো আর প্রেম নিবেদন করার সুযোগ ছিল না। আমরা সকলে নীলাম্বরী করে ডাকতাম। সুদিন ডাকত নীলা। নীলা সব সময়ে গাঢ় নীল রংয়ের জরির পাড়-শাড়ী পড়ে কলেজে আসত। এত সুন্দর গায়ের রং যেন ঝরঝরে সোনালী নীল। আকাশের মত লাগত। কলেজের ছলে-মেয়েদের মুখে ওর সম্বন্ধে অনেক গল্প শুনেছি। সুদিন বেশ লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ ছেলে ছিল। প্রায়ই কলেজে অনুপস্থিত থাকত। শুনতাম প্রেম কানন ছিল দুজনের প্রেমের আরাধনায় সুদিন প্রায়ই নীলাদের বাড়ী যেত। নীলার মা নীলাকে বকত। কলেজ কামাই হচ্ছে, কলেজে যাস না। কলেজ থেকে শিক্ষকদের চিঠি আসত। একবার নীলাকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। কলেজ, বাড়ী, বন্ধু-বান্ধবীদের বাড়ী, কোথাও নেই। শেষ পর্যন্ত এক বন্ধুর কাছে খবর পেলাম সুন্দরবন গিয়েছে। সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগরের উত্তল তরঙ্গ ওদের প্রেমের খোরাক জুগিয়েছিল।

(চলবে————)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।