জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৬৬

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত সংখ্যার পর) : চাঁদ নিজেই জানে না চাঁদের এত রূপের কথা। জানে না বলেই সে এত সুন্দর। এই চাঁদ মানুষের মনে জোগায় কত কল্পনার রামধনু। সুন্দরের পুঁজায় মানুষের মনের কত কথা তাদের কাছে বলি। এই চাঁদকে দেখে মানুষ আজও তার রূপ বর্ণনা ব্যাখ্যা করতে পারে নি। আকাশ কত বড়, কত প্রসস্ত, কত উদার, অনন্ত অসীম, সে নিজের সম্বন্ধে কিছু জানে না বলেই সে এত বিশাল।
আকাশের ছোট তারাগুলি কত সুন্দও ঝিকমিক ঝিকমিক করে জ্বলে আর নিভে হাত ছানি দিয়ে মানুষের মনকে কাছে ডাকে। মানুষ অনদি অনন্তকাল থেকে তার পানে চেয়ে চেয়ে ভাবছে। অথচ এই তারাগুলো জানে না, তারা এই পৃথিবীতে কত আনন্দ দিচ্ছে, তৃপ্তি দিচ্ছে, জানে না বলেই তারা এত প্রিয়। কাল দেখলাম তোমার গায়ে কোন আভরণ নেই, আভরণ নেই বলে তোমায় বেশী সুন্দর লাগছে। এত সুন্দর তোমাকে আমার কোন দিন লাগেনি। তুমি একবার পাকশী পদ্মার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পদ্মার রূপের সাথে তোমার রূপ একদম মিলে যাবে। সে তোমাকে দেখে বলবে, ওগো তোমার মত আমার একটি মেয়ে ছিল। আমি যখন পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে পদ্মার অথই জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিলাম, তখন দেখলাম পদ্মা অঝোর ধারায় কাঁদছে, আমাকে দেখে চোখ মুছে বলল, তুমি কে গো ? আমি বললাম- আমি ? আমি বিদেশী। এ কথা শুনে সে চমকে উঠে পালাতে চাইল, আমি তার আঁচল টেনে ধরলাম। সে বলল, আমার ছেড়ে দাও, আমায় ছেড়ে দাও।
আমি বললাম, না আগে বল, কেন তুমি পালাতে চেয়েছিলে ? সে বলল, বিদেশীকে দেখলে আমার বুক কাঁপে, আমি পালিয়ে যাই। পদ্মা আরো বললো, এই যে নীল, লাল, পাল তুলে জেলেরা ঘুরে ঘুরে মাছ ধরছে। ওদের নৌকায় করেই আমার আকাশীকে নিয়ে বিদেশী পালিয়ে গেল। আমি যেন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আকাশী ? সে আবার কি নাম ? পদ্মা বলল, হ্যাঁ, আকাশী, এই আকাশের মত সে সুন্দর। মেঘ রংয়ের শাড়ী পড়ে সে পদ্মার পাড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াত। আলুলায়িত কুন্তল কেশ ছড়িয়ে নদীর পারে পারে সে কুড়াত পাথরের নুড়ি, বসে থাকত বড় শিলা খন্ডের উপর, নদীর জলে পা ছড়িয়ে চেয়ে থাকত নীল আকাশের দিকে।
আকাশী নাম রেখেছিলাম বলে সে যেন আকাশকে বড় ভালবাসত। আর আকাশী রংয়ের শাড়ী পড়ত। চুড়ির রংও ছিল আকাশী। সূর্যের মত গায়ের রংয়ের সাথে আকাশী রংয়ের চুড়ি তাকে বড় মানাত। এক বিদেশী প্রায়ই আসত এই ব্রীজের উপর। ভাবতাম হয়ত ব্রীজ দেখতে এসেছে অথবা জেলেদের নৌকা দেখতে এসেছে। আকাশী ওকে দেখে রিনিঝিনি করে হেসে উঠল। সে হাসির শব্দে ব্রীজের লোহা লক্কড়গুলি ঝনঝন করে বেজে উঠত। বিদেশী তরতর করে ব্রীজ দিয়ে নেমে এলে আকাশীর কাছে এসে দাঁড়াত। আকাশী আড়চোখে তার পানে চেয়ে দেখত। বিদেশী বলত কে কে তুমি ? আকাশী বলত, আমি আকাশী। আকাশী খিল খিল করে হেসে উঠত।
(চলবে——)
