সর্বশেষঃ

আমার ‘বাবা’।। মোহাঃ মাকসুদুর রহমান

মোহাঃ মাকসুদুর রহমান। সম্পাদক- দৈনিক ভোলার বাণী।

বাবা-মা নিয়ে আমাদের সকলেরই অনুভূতির শেষ থাকে না। প্রত্যেক বাবা-মা এর ভিন্ন ভিন্ন জীবন কাহিনী থাকে। আজ বিশ্ব বাবা দিবস উপলক্ষে নিজের বাবার সাথে ঘটে যাওয়া জীবন ডায়েরি থেকে নেওয়া কিছু অনুভূতির স্মৃতিচারণ করেছেন ভোলার সকল শ্রেণি পেশার মানুষের প্রিয় পত্রিকা দৈনিক ভোলার বাণী সম্পাদক মোহাঃ মাকসুদুর রহমান। নিজের বাবাকে নিয়ে তার অনুভূতির কথা গুলো তিনি তার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে লিখেছেন। ভোলার বাণী’র পাঠকদের জন্য তার লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

বাবা ছিলো আমাদের ( ভাই,বোন) বন্ধু। শুধু আমাদেরই নয় আমার সকল স্বজনদের কাছের মানুষ, বিপদের বন্ধু, বিশেষ করে চাচা,ফুপু, প্রতিবেশীদের কাছে।

আমার কাছে প্রতিটা মুহূর্তই বাবা,মা দিবস। কারন ঘুম যাওয়ার আগ মুহূর্ত বাবার কথা মনে পরে। কমপক্ষে দিনে পাঁচ বার। পাচ ওয়াক্ত নামাজের পর তাদের জন্য দোয়া করি যেমনটা বাবার কাছ থেকে শিখেছি।
করোনা আসায় বাবার কিছু স্মৃতি লালন করছি।
ছোটবেলায় বাবার ইমামতিতে আমরা সাত ভাই বোন এবং মা নামাজ পরতাম আর হাদিস, কোরআনের তাৎপর্য আর মানুষের সাথে ব্যবহার,কথাবার্তা, চালচলন,চরিত্রের সমন্ধে আলোচনা হতো।
আমার বাবা যখন অন্যায়ের জন্য আমাকে মারতো তখন আমার মা বলতো আপনার ছেলেতো ব্যাথা পায়না, ব্যাথা পায় আপনার লাঠিটা।
আমার বাবার বন্ধুত্বের কথা শেষ করতে পারবোনা। তবে দুতিনটা ঘটনার কথা বলে শেষ করবো।
# বাবা যখন রিকশায় বসতো তখন ডানপাশে বসতো আর আমাকে বামপাশে বসিয়ে তার বামহাত দিয়ে আমাকে শক্ত করে ধরে রাখতেন, বড় হওয়ার পরেও এই কাজগুলো করতেন,জিজ্ঞেস করলে বলতেন এক্সিডেন্ট হলে আমি হব, তমি বেঁচে থাকলেই আমার সন্মান।
# ১৯৯৮ সালের ঘটনা, আমি তখন ঢাকায় ব্যাবসা করি, আমার কাছে ভোলা উকিল পাড়ার এক প্রভাবশালী ৫০ হাজার টাকা পেতেন,দিতে একটু দেরি হয়ে গেছে, বর্ষার মধ্যে আমি ভোলায় আসি, ঐলোকরা জানলো আমি বাসায়, তখন তারা ৪/৫ জন বিকেলে আমাকে খুজতে বাসায় এসে দেখে আমার বাবা উঠানে হাটছে,তারা বাবাকে আমার কথা জিজ্ঞেস করলে বাবা বলেন, বসেন, বলেন কেন। বাবা বল্লেন ঔ ঘরে,যেই ঘরটায় আমরা লেখাপড়া করি। তখন তারা আমার বাবাকে বলে আপনি জানেন আমরা আপনার ছেলেকে ধরতে বসছি,আপনি এরিয়ে যেতে পারতেন,কেন করেননি,বাবা উত্তর দিলো মিথ্যা বলা সমাধান নয়।
তখন বাবা তাদেরকে বল্লেন,যান মাঘ মাস আসুক টাকা দিয়ে দিবো,তারা চলে গেল এবং মাঘ মাসে টাকা পেল।
আমার বাবা জানতেন আমি অন্যায় পথে কোন টাকা
খরচ করিনা।
# বাবা অসুস্হ হওয়ার ২/৩ মাস আগে আমাকে বলে ভোলা শহরের সকল ব্যাবসায়ীদের কাছে যাবো বিশেষ করে যাদের সাথে মাল ক্রয়ের সম্পর্ক ছিলো,কেন, আমার কাছে কেহ টাকা পেলে দিবো,এমনি ভাবে ঢাকা,বরিশালে, আলহামদুল্লিলাহ, জিয়া সুপার মার্কেটের একজন ছাড়া কেহ আমার বাবার কাছে কেহ টাকা পায়নি।কারনটা ছিলো আমরা কাপড়,জুতা,ঔষধ,লাইব্রেরী, জুয়েলারী মুদি,সকল ব্যবসায়ীদের কাজ থেকে বাৎসরির হিসেবে লেনদেন করতাম,পৌষ,মাঘ মাসে জমি লগ্নি করে টাকা দিতো। # ২০০০ সালে আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পরলেন,ভীষণ অসুস্থ, তার সাথে একজন সেবক প্রয়োজন, আমিতো ঢাকা থাকি,ছোটভাই বাবার ব্যাবসা দেখে, কে করবে বাবার খেদমত, তখন আমি ঢাকার সবকিছু ছেড়ে ভোলা এসে বাবার খেদমতে নিয়োজিত হলাম।
আমার মনে হলো পৃথিবীর সব সুখ আমার হাতের মুঠে।
বাবাকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া,ঔষধ খাওয়ানো, পায়খানা প্রসাব করানো,হুচু করানো, এবং রাতে বাবার সাথে ঘুমানো। সবই আমি করেছি,যা বন্ধুবান্ধব,এলাকাবাসী যানতো, অনেক সময় দেখতো।
তখন মনে হতো আমার মাথার উপর রহমতের ছাদ আছে। এমন হাজার ঘটনা বলে শেষ করা যাবেনা।
# আমাদের বাসায় সবসময় কাজ করতো, তাকে বলতাম আমরা বিদেশি,কিন্তু তার নাম নুরুল ইসলাম।
বাবা তাকে সবসময় বলতো নুরুল ইসলাম মিয়া।
একদিন বিরক্ত হয়ে বাবাকে বলি, আপনি বিদেশি কে মিয়া বলেন কেন? আপনারা না জমিদার।
বাবা বল্লো ওনাকে যে আল্লাহ বানিয়েছে, আমাকে তোমাকে একই আল্লাহ বানিয়েছে, এইজন্য বলি,তাছাড়া গরীবদের সন্মান করলে আল্লাহ খুশি হন।
# আমার বাবা যখন মাদ্রাসায় সেবেনে পড়ে তখন আমাদের বাড়ীর মসজিদের কেশিয়ার ছিলেন,অনেক মসজিদ তৈরি করছেন এবং সেক্রেটারি, সভাপতি ছিলেন,তার কাছ থেকে শিখেছি কিভাবে বিপদে মানুষের পাশে থাকতে হয়, কিভাবে নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়াতে হয়। শিখেছি কিভাবে সংগঠন করতে হয়,বাবা জিয়া সুপার মার্কেটের মৃত্যু পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন, তিনি ৫/৬ বছর অসুস্থ ছিলেন, যেতে পারেনি জিয়া মার্কেটে তার পরেও তাকে সভাপতির পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়নি, বাদ দেওয়া হয়নি বাবার হাতে গড়া বায়তুল মামুর মসজিদ থেকে।
# ২০০৬ এর ৫ই জুনের কিছু দিন আগের কথা। বাবাকে গোসল করিয়ে চেয়ারে বসিয়ে গালে চুমা দিয়ে বলি, বাবা আমাকে একটু দোয়া দেন,,,,।
বাবা জাটকা মেরে বলে যাও মিয়া আমার দোয়া সব তোমার জন্য, তুমি যে কাজ আমার জন্য করতেছো,এমনেতেই তোমার জন্য দোয়া চলে আসে।
বাবার মুখে কোনদিন তুই সব্দটি শুনিনায়।
সবসময় তুমি আর আপনি।
বাবা নেই,চলে গেলেন সেই ৫ই জুন ২০০৬ সনে,
কিন্তু তার দোয়া আমর সাথে ছায়ার মতো চলে।
# আমি চাই এযুগের ছেলে মেয়েরা বাবা মাকে শুধু সন্মান ই নয় তাদেরকে সম্পদ মনে করবে।
আমার বাবা মায়ের জন্য দোয়া চাই সকলের কাছে তারা জেনো জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ আসনে আসিন হন।
বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবা মাকে আমার দোয়া এবং ভালোবাসা, আর যারা মৃত তাদের আল্লাহপাক জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ আসনে আসিন করেন।

মোহাঃ মাকসুদুর রহমান
সম্পাদক- দৈনিক ভোলার বাণী।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।