সর্বশেষঃ

আদর্শ শিক্ষক হিসেবে বাবাই ছিলেন আমার শ্রেষ্ঠ নায়ক

লেখক মোস্তাফিজুর মিশুক। ফাইল ফটো

এখনো ভুলিনি বাবার হাতে হাত রেখে প্রথম স্কুলে প্রবেশের স্মৃতি। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে ঈদগাহে যাওয়ার দিনগুলোর কথা। ভুলেনি পা পিছলে পড়তে গিয়ে সেই হাতটি। যে হাতটি প্রথমেই সহায়ক হাত হিসেবে এগিয়ে আসত সেই হাতটির কথা। সে ভিন্ন কেউ নন, তিনি আমার বাবা।

পৃথিবীর সব সন্তানরাই বাবার হাত ধরে প্রথমে স্কুলে যায়। সে সুযোগটা আমারও হয়েছিলো। শুধু স্কুলে যাওয়া নয়, ক্লাসরুমেও বাবার শেখানো হাতে খড়ি।শৈশবটা পাড় করেছি বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া আসা আর ক্লাস রুমে বাবার পাঠদান।শিক্ষকের ছেলে হিসাবে পেতাম স্কুলের সবার ভালোবাসা।

বাবা আমাকে প্রায়ই একটা কথা বলতেন, আমার সব ছেলে মেয়ে এই স্কুল থেকেই মানুষ হয়ে গেছে। কোনো দিন কারোও খারাপ রিপোর্ট শুনতে পাই নিই। তোমার বেলায়ও যেন এর ব্যতিক্রম না ঘটে। স্কুলে সব সময় বাবার ভয়ে থাকতাম।স্কুলে বাবাকে শিক্ষকের সম্মান প্রদান করতাম ।

বাবার মাসিক আয় ছিলো ৫হাজার টাকার কিছু কম।এই বেতনেই সংসার আর ৫ভাই-বোনের পড়ালেখার খরচ চলতো।জীবনের খুব বেশি বিলাসিতা শখ পূরণ না করতে পারলেও বই খাতা কলম সহ শিক্ষার সকল উপকরণ প্রয়োজন মত মেটাতে কোনো দিন কার্পণ্য করেননি।স্কুল ছুটি শেষে আমি বাজারের ব্যাগ নিয়ে বাজারে আসতাম।বাবা তো জানতো আমার পছন্দের মাছ ছিলো কই। যেদিন বাজারে কই মাছ উঠতো,সেদিন আর তিনি মিস করতেন না।

বাবার সাথে বাজার করাটা আমার একসময়ের শখে পরিনত হয়।সেই থেকেই ভালো বাজার করাটা রপ্ত করে ফেলি।বাজার শেষে বাবা আমাকে ২ টাকা দিতেন।আমি যদি কখনো শত কোটি টাকা ও রোজকার করি, সেই ২ টাকার ভালোবাসার কথা কোনোদিন ভুলবো না।অন্য বাবাদের মতো আমার বাবাও বলতেন তোদের কাছে কিছুই চাওয়ার নাই।আমার চাওয়া একটাই। তোরা পড়াশোনা করে মানুষ হও, শিক্ষিত হও। নিজের এবং সমাজের মঙ্গল বয়ে আনো।

পাঠ্য বইয়ের বাহিরেও বাবা আমাকে সহ শিক্ষা কার্যক্রমে উৎসাহী করতেন। রচনা প্রতিযোগীতা, বক্তৃতা,আবৃত্তি ছবি আঁকা ইত্যাদি। মানুষ গড়ার এই মানুষটি সব সময়ই ছিলেন শিক্ষানুরাগী।বাবা ছিলেন স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক এবং উদ্দ্যোক্তা।শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না।
সমাজে মেয়েদের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ছিলেন প্রতিবাদী কন্ঠস্বর এবং ঝরে পড়া মেয়েদেরকে স্কুলমুখী করার ছিলেন একান্ত প্রচেষ্ঠা।

সমাজে গরীব মেধাবী অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ ও বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিতেন।গ্রামে বাবাই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি নিয়মিত খবরের কাগজ পড়তেন।শিক্ষিত যুবকদের পত্রিকা পড়তে উৎসাহী করতেন। বাবা নিজে শিক্ষক থাকলে ও আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন ব্যাংকারের।জানিনা বাবার সে স্বপ্ন পূরন করতে পারি কিনা।শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন মধ্যমনি,প্রায় সময়ই শিক্ষার্থীরা টেলিফোনে বাবার খোঁজ খবর নিতেন এবং বাবাকে দেখতেও আসতেন।

বাবার কর্ম ময় জীবনে মানুষের এই মহৎ ভালোবাসায় সন্তান হিসেবে গর্বীত।সৃষ্টিকর্তার নির্ধারিত নিয়মে বাবা এ বছরের গত ৩০মে হৃদযন্ত্র ক্রীয়া বন্ধ হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। বাবা ছাড়া এই পৃথিবী বড়ই শুন্য লাগে। বড় ভালোবাসি বাবা তোমাকে। আদর্শ শিক্ষক হিসেবে বাবাই ছিলেন আমার শ্রেষ্ঠ নায়ক। পরপারের জীবনে আল্লাহ যেন বাবাকে ভালো রাখেন এবং পৃথিবীর সব বাবারা ভালো থাক এটাই কাম্য ।

লেখকঃ
মোস্তাফিজুর মিশুক
সোশাল এ্যাক্টিভিস্ট।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।