সর্বশেষঃ

জলাভূমিতে কুঁচিয়া শিকার, জীবিকার লড়াইয়ে চরাঞ্চলের মানুষ

কুঁচিয়া শুধু স্থানীয় মানুষের খাদ্য বা জীবিকার উপকরণ নয়; এর বাণিজ্যিক গুরুত্বও রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুঁচিয়ার চাহিদা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও কুঁচিয়া রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। ফলে জলাভূমিনির্ভর এই পেশা গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

কুঁচিয়া সাধারণত জলাশয়, বিল, খাল ও কাদাযুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে। জলাভূমি ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার কারণে দেশীয় জলজ প্রাণীর বিচরণ ও প্রজনন পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কুঁচিয়া শিকারিদের জীবিকায়ও। কারণ তাঁদের কর্মসংস্থান সরাসরি জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জলাভূমি সংরক্ষণ, কুঁচিয়ার প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র রক্ষা, শিকারিদের প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নত হতে পারে।

 

চরাঞ্চলের এসব কুঁচিয়া শিকারির অধিকাংশই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের নেই স্থায়ী কর্মসংস্থান, নেই সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। অথচ তাঁদের শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় জলজ সম্পদ আহরণ ও বাজার অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

কুঁচিয়া শিকারিদের তালিকা তৈরি, সহজ শর্তে ঋণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, নিরাপদ সংগ্রহব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জলাভূমির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

 

ভাত-কাপড়ের তাগিদে যাঁরা প্রতিদিন জলাশয়ের কাদামাটিতে নেমে কুঁচিয়া খোঁজেন, তাঁদের কাছে এটি নিছক পেশা নয়, এটি বেঁচে থাকার সংগ্রাম। চরফ্যাশনের এসব প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গ্রামীণ অর্থনীতির আড়ালে থাকা অনেক শ্রমজীবী মানুষের গল্প এখনো যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।

ভাত-কাপড়ের সংস্থান করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জলাভূমিতে কুঁচিয়া শিকার করছেন চরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষ। সকাল থেকে সন্ধ্যা—কখনো কোমরসমান পানি, কখনো কাদামাটির জলাশয়ে নেমে চলে তাঁদের নিরন্তর সংগ্রাম। কারও হাতে বাঁশের তৈরি ফাঁদ, কারও হাতে কুঁচিয়া ধরার সরঞ্জাম। দিনের শেষে পাওয়া কুঁচিয়া বিক্রির টাকায় চলে সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। তাঁদের কাছে কুঁচিয়া শিকার শুধু পেশা নয়, বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন।

 

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওসমানগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয় ও আশপাশের এলাকায় দেখা যায় এমন জীবনসংগ্রামের চিত্র। স্থানীয়ভাবে কুঁচিয়া শিকারকে কেউ বলেন ‘কুঁচি ধরা’, আবার কেউ বলেন ‘কুঁচিয়া মারা’। দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এলাকার অনেক দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা।

 

এমনই একজন কুঁচিয়া শিকারি অবিনাশ সরকার। তাঁর সঙ্গে একই পেশায় যুক্ত রয়েছেন হরিপদ সরকারের মতো আরও অনেকে। অভাবের সংসারে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বছরের পর বছর জলাশয়ে কুঁচিয়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তাঁরা।

 

অবিনাশ সরকার বলেন, “কুঁচিয়া ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করি। প্রতিদিন জলাশয়ে নামতে হয়। কোনো দিন বেশি কুঁচিয়া পাই, আবার কোনো দিন অনেক কষ্ট করেও তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তারপরও পেটের তাগিদে এই কাজ করতে হয়। অন্য কোনো কাজের ব্যবস্থা থাকলে হয়তো এভাবে কষ্ট করতে হতো না।”

 

একই পেশায় নিয়োজিত হরিপদ সরকার বলেন, “কুঁচিয়া শিকার করা সহজ কাজ নয়। কাদাপানি ও জলাশয়ে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে হয়। কুঁচিয়া বেশি পেলে কিছুটা স্বস্তি মেলে, আর কম পেলে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আমাদের মতো দরিদ্র মানুষের জন্য নিয়মিত কাজের সুযোগ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে অনেক উপকার হতো।

 

কুঁচিয়া শিকারে ব্যবহার করা হয় বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এগুলো ‘দোয়াইর’ বা ‘কাঁদা’ নামে পরিচিত। বাঁশ-বেত ও প্লাস্টিকের সুতা দিয়ে তৈরি এসব ফাঁদ জলাশয়ের কাদামাটি ও গাছপালার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে বসানো হয়। পরে কুঁচিয়া ফাঁদে প্রবেশ করলে তা সংগ্রহ করেন শিকারিরা।

 

জলাশয়ের গভীরতা, কাদার ধরন এবং কুঁচিয়ার বিচরণস্থল বুঝে ফাঁদ বসাতে হয়। এ কাজে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে জলাশয়ের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে শিকারিদের কাজের ধরনও বদলে যায়। তাঁদের আয় নির্ভর করে প্রতিদিনের সংগ্রহের ওপর।

 

সংগৃহীত কুঁচিয়া স্থানীয় বাজার ও পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কুঁচিয়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে মৌসুম, আকার, চাহিদা ও বাজারভেদে দাম পরিবর্তিত হয়। ওসমানগঞ্জের লতিফ মিয়ার হাটসহ আশপাশের বাজারগুলোতে কুঁচিয়া কেনাবেচা হয়। স্থানীয় পাইকাররা শিকারিদের কাছ থেকে কুঁচিয়া সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে বড় বাজারে সরবরাহ করেন।

 

কুঁচিয়ার পাইকার হালিম মুন্সি বলেন, “স্থানীয় শিকারিরা জলাশয় থেকে কুঁচিয়া ধরে আমাদের কাছে বিক্রি করেন। এরপর চাহিদা অনুযায়ী সেগুলো অন্য বাজারে সরবরাহ করা হয়। কুঁচিয়ার দাম ও চাহিদা সব সময় এক রকম থাকে না। শিকারিরা ন্যায্যমূল্য পেলে তাঁদের কষ্ট কিছুটা সার্থক হবে। এ ব্যবসাকে আরও ভালোভাবে এগিয়ে নিতে সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের উন্নত ব্যবস্থা প্রয়োজন।”

 

শিকারি ও পাইকারদের মধ্যে গড়ে উঠেছে স্থানীয় কেনাবেচার একটি অর্থনৈতিক চক্র। তবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের উন্নত ব্যবস্থা না থাকায় এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। বাজারে সরাসরি বিক্রির সুযোগ বাড়লে শিকারিরা তাঁদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।

 

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।