সর্বশেষঃ

ভোলায় রাস্তার পাশে অপরিচ্ছন্ন খাবার, স্বাদের আড়ালে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

মো: সোহেল রানা, স্টাফ রিপোর্টার

ক্ষুধা মেটাতে কয়েক মিনিটের জন্য থামছেন মানুষ। সামনে ধোঁয়া ওঠা সিঙ্গারা, রঙিন শরবত, ঝালমুড়ি, ফুচকা কিংবা চটপটির প্লেট। দাম কম, স্বাদ মুখরোচক—তাই ব্যস্ত শহরে এসব খাবারের ক্রেতারও অভাব নেই। কিন্তু খাবারের সেই লোভনীয় গন্ধের আড়ালেই কোথাও উড়ছে ধুলা, কোথাও জমে আছে ময়লা পানি, আবার কোথাও মাছি বসছে খাবারের ওপর। ক্ষুধা মিটলেও এসব খাবারের সঙ্গে শরীরে ঢুকছে না তো অদৃশ্য কোনো জীবাণু—এমন প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

ভোলা শহরের নতুন বাজার, বরিশাল দালান, কাবিল মসজিদের মোড়, সরকারি স্কুলের মাঠ, ইলিশ ফোয়ারা ও বক ফোয়ারার আশপাশসহ বিভিন্ন ব্যস্ত সড়ক ও ফুটপাতে প্রতিদিনই দেখা যায় এমন চিত্র। রাস্তার পাশে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে নানা ধরনের খাবার। কোথাও খোলা ড্রামে পানি, কোথাও ধুলোমাখা টেবিল। খাবার তৈরি ও পরিবেশনের সময় অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি।

পথচারীদের ব্যস্ত চলাচল, যানবাহনের ধোঁয়া আর বাতাসে উড়ে আসা ধুলোর মধ্যেই সাজিয়ে রাখা হচ্ছে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, ভাজাপোড়া ও শরবত। খাবার ঢেকে রাখার ব্যবস্থা নেই অনেক দোকানে। রান্না বা ভাজার পর দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় পড়ে থাকছে খাবার। ফলে ধুলাবালি, মাছি ও অন্যান্য জীবাণুর সংস্পর্শে খাবার দূষিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু-কিশোররা। স্কুল-কলেজ ছুটির পর কিংবা বিকেলের অবসরে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটপাতের দোকানে ভিড় জমায় তারা। কম দামে পছন্দের খাবার পাওয়ায় এসব দোকান তাদের কাছে হয়ে উঠেছে সহজ ও পরিচিত খাবারের জায়গা। কিন্তু যে পানি দিয়ে ফুচকা বা চটপটির উপকরণ ধোয়া হচ্ছে, তা কতটা নিরাপদ—অথবা একই পানি দিয়ে কতবার থালা-বাসন ও খাবারের সরঞ্জাম পরিষ্কার করা হচ্ছে—এসবের কোনো নিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রেই নেই।

শুধু খাবার নয়, ব্যবহৃত পানিও স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভ্রাম্যমাণ অনেক দোকানে একই পানি দিয়ে বারবার হাত, থালা-বাসন ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ধোয়া হয়। খাবার পরিবেশনের আগে বিক্রেতার হাত পরিষ্কার করার বিষয়টিও সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়। ফলে খাবার যতটা আকর্ষণীয় দেখায়, তার নিরাপত্তা নিয়ে ততটাই থেকে যায় অনিশ্চয়তা।

ভোলা সিভিল সার্জন মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, অপরিচ্ছন্ন ও দূষিত খাবার খেলে ডায়রিয়া, বমি, পেটের পীড়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত ও খাদ্যবাহিত রোগ হতে পারে। শিশু, বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষের ক্ষেত্রে এসব রোগের প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও থাকে।

তবে রাস্তার পাশে খাবার বিক্রির সঙ্গে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিই জড়িত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকা। কাবিল মসজিদের মোড়ে ছোট একটি খাবারের দোকান চালান মিজান। তাঁর ভাষ্য, এই দোকান থেকেই চলে পরিবারের খরচ। দোকান বন্ধ করে দিলে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে গিয়ে তাঁদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোলা সদর রোডের বাসিন্দা আসলাম বলেন, এসব খাবার স্বাস্থ্যসম্মত নয়, তা তাঁরা জানেন। কিন্তু বড় রেস্টুরেন্টের তুলনায় দাম কম এবং স্বাদও ভালো হওয়ায় অনেক সময় বাধ্য হয়েই এসব খাবার খান।

পথচারী আবদুস সালাম বলেন, রাস্তার পাশের খাবার খাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁরা জানেন। তারপরও সাময়িক ক্ষুধা মেটাতে এসব খাবার কিনে খান।

নগরবাসীর অভিযোগ, ফুটপাত ও রাস্তার পাশে খাবার বিক্রির দৃশ্য ভোলায় নতুন নয়। কিন্তু নিয়মিত তদারকি ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় অনেক বিক্রেতাই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। এতে একদিকে যেমন মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে শহরের পরিবেশও হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন।

তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু উচ্ছেদ বা জরিমানা করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন বিক্রেতাদের নিরাপদ খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া, নিরাপদ পানি ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা, নিয়মিত নজরদারি চালানো এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে।

সিভিল সার্জন মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু বিক্রেতার নয়; ভোক্তা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন—সবার। নিয়মিত অভিযান, খাবারের মান পরীক্ষা, নিরাপদ পানি ব্যবহারে বাধ্য করা এবং বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি ক্রেতাদেরও সতর্ক হতে হবে।

ভোলার ব্যস্ত সড়কের পাশে রাস্তার খাবার এখন নগরজীবনেরই একটি পরিচিত অংশ। অল্প টাকায় ক্ষুধা মেটানোর এই সহজ সুযোগ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ এক প্লেট চটপটি বা এক গ্লাস শরবত হয়তো মুহূর্তের ক্ষুধা মেটায়, কিন্তু অপরিষ্কার পানি কিংবা জীবাণু মিশে থাকলে সেই স্বাদের মূল্য দিতে হতে পারে অসুস্থতার মাধ্যমে।

শহরের ফুটপাতে তাই প্রশ্নটি শুধু খাবারের স্বাদ কিংবা দামের নয়। প্রশ্নটি মানুষের সুস্থ থাকার অধিকার নিয়েও। ধুলা, ময়লা ও জীবাণুর ভিড়ে সাজানো খাবারের দিকে হাত বাড়ানোর আগে নিরাপত্তার বিষয়টিও যেন ক্রেতা, বিক্রেতা ও প্রশাসন—তিন পক্ষই গুরুত্ব দিয়ে দেখে, সেটিই এখন সময়ের দাবি।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।