সর্বশেষঃ

চরফ্যাশনে জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় ঝরে পড়ছে হাজারো শিশু

অনলাইন ডেক্স

ভোরের আলো ফুটতেই নদীর বুক চিরে ছুটে চলে ছোট ছোট নৌকা। কোথাও জাল গুছিয়ে নিচ্ছে কিশোর হাত, কোথাও জীবিকার তাগিদে বাবা-মায়ের সঙ্গে ছুটছে শিশুরা। অথচ এই বয়সে তাদের থাকার কথা ছিল বই-খাতা নিয়ে বিদ্যালয়ের বেঞ্চে। কারও হাতে থাকার কথা ছিল কলম, কারও চোখে থাকার কথা ছিল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, দারিদ্র্য আর অনিশ্চিত জীবনের টানে চরফ্যাশনের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের বহু শিশুর সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বারবার ভাঙছে বসতভিটা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাস্তাঘাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কখনো বন্যার পানিতে ডুবে যাচ্ছে বিদ্যালয়ের আঙিনা, কখনো নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো। দুর্যোগের পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দিনের পর দিন বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না শিশুরা। দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর অনেকেই আর শ্রেণিকক্ষে ফিরছে না। জীবিকার তাগিদে কেউ যাচ্ছে মাছ ধরতে, কেউ যুক্ত হচ্ছে কৃষিশ্রমে, আবার অনেক কিশোরীকে বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে থামিয়ে দিতে হচ্ছে পড়াশোনা।

একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার অনুসন্ধান বলছে, প্রান্তিক ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৪২ শতাংশ পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার আগেই লেখাপড়া ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব, অবকাঠামোগত ক্ষতি, দারিদ্র্য, বাল্যবিয়ে, শিশু শ্রম, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিহীনতা এবং যোগাযোগ সমস্যাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চরফ্যাশন উপজেলার আয়তন ১ হাজার ১০৬ বর্গকিলোমিটার। বিস্তীর্ণ চর ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় রয়েছে ২৬০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১১০টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, ৭০টি সংযুক্ত ইবতেদায়ি, ১৮টি কিন্ডারগার্টেন এবং এনজিও পরিচালিত ১৩৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বছরের শুরুতে বিদ্যালয়গমনের উপযোগী প্রায় সব শিশুই ভর্তি হলেও শিক্ষাজীবনের পথ যত এগোয়, ততই কমতে থাকে তাদের সংখ্যা।

প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যে, ২০২৫ সালে চরফ্যাশনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বালকদের ভর্তি হার ছিল ৯৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং বালিকাদের ৯৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। একই সময়ে ঝরে পড়ার হার দেখানো হয়েছে ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ। বিদ্যালয়গুলোর তথ্যে শতভাগের কাছাকাছি ভর্তি নিশ্চিত হলেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু ছাড়া ভর্তিযোগ্য ২০৮ শিশু বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি।

মাধ্যমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা নেই। অফিস সহকারী মোর্শেদা বলেন, ‘ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের ডকুমেন্টস বা কোনো তালিকা আমাদের কাছে নেই।’

তবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য ও বিভিন্ন বিদ্যালয়ের চিত্রে ঝরে পড়ার বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর একেএম আবুল খায়ের বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। শহর এলাকায় ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক কম হলেও চরাঞ্চলে অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত পরিবারের শিশুরাই বেশি ঝরে পড়ছে বলে জানান তিনি।

চরফ্যাশনের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে শিশুশ্রমের একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে নদী ও সাগর। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার ২৯৬টি নৌকা ও ট্রলার রয়েছে। এসব নৌকা ও ট্রলারে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী হাজারো শিশু নদী ও সাগরে মাছ ধরার কাজে যাচ্ছে। উপজেলায় মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত ৪৩ হাজার ২৮৫ জন জেলের একটি অংশ জীবিকার কাজে সন্তানদের সঙ্গে নেয়। কেউ কেউ আবার বেতনভুক্ত শিশু শ্রমিকও নিয়োগ করেন।

নদীর ঢেউ, ঝড় আর অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই করে এসব শিশু। যে বয়সে তাদের বিদ্যালয়ের মাঠে খেলাধুলা করার কথা, সে বয়সেই অনেকের হাতে উঠে আসে মাছ ধরার জাল। পরিবারের আয় কমে গেলে কিংবা দুর্যোগে বসতভিটা ও সম্পদ হারালে শিক্ষার খরচকে অনেক পরিবারই বিলাসিতা হিসেবে দেখতে শুরু করে। তখন শিশুর শ্রমই হয়ে ওঠে পরিবারের টিকে থাকার অন্যতম অবলম্বন।

শুধু নদী বা সাগর নয়, কৃষিকাজ ও ইটভাটাতেও যুক্ত হচ্ছে শিশুরা। চরফ্যাশনে ৩৩টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি বৈধ এবং ১৭টি অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব ইটভাটায় অন্তত ৫০ শিশুকে মৌসুমি চুক্তিতে কাজ করানো হচ্ছে। ধানের মৌসুমেও হাজারো শিশু শ্রমিক দিয়ে ধান কাটানো হয় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক।

বাল্যবিয়েও চরাঞ্চলের মেয়েদের শিক্ষাজীবনের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চর কুকরি-মুকরি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুসেন দত্ত জানান, বছরের শুরুতে বিদ্যালয়ে ২৯০ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বছর শেষে শিক্ষার্থী ছিল ২২২ জন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১১, সপ্তম শ্রেণিতে ২০, অষ্টম শ্রেণিতে ১৮, নবম শ্রেণিতে ১০ এবং দশম শ্রেণিতে ১০ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। এর মধ্যে নবম ও দশম শ্রেণির প্রায় ১৫ শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে বলে জানান তিনি।

ঢালচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও একই চিত্র। অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ১৫ শিক্ষার্থী বাল্যবিয়ের কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে। নদীভাঙনে বিদ্যালয়ের মূল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি চরফ্যাশনের মূল ভূখণ্ডের রসুলপুর ৮ কপাট এলাকায় একটি শাখায় স্থানান্তর করা হয়েছে। ভাঙনকবলিত চরাঞ্চলের বিদ্যালয়টিতে এখন শিক্ষার্থী রয়েছে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জন।

শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকটের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত। বন্যার সময় চরাঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট তীব্র হয়। বাড়ে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের প্রকোপ। অসুস্থতার কারণে শিশুরা দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ের বাইরে থাকে। এক পর্যায়ে পড়াশোনার সঙ্গে তৈরি হয় দূরত্ব। ভারী বৃষ্টি বা বন্যার পর রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে গেলে অনেক দুর্গম চর থেকে বিদ্যালয়ে পৌঁছানোও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

দুর্গম অবস্থান, যোগাযোগের সংকট, অভিভাবকদের দারিদ্র্য, শিক্ষার ব্যয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মৌসুমি শ্রমের সুযোগ—সব মিলিয়ে শিশুর সামনে তখন বইয়ের চেয়ে জীবিকার পথই বড় হয়ে ওঠে। ইলিশের মৌসুমে নদীতে মাছ পড়লে অনেক পরিবার সন্তানদেরও নৌকায় নিয়ে যায়। ধান কাটার মৌসুমে তারা মাঠে নামে। আর পরিবারের মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে দারিদ্র্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত হয় বাল্যবিয়ের ঝুঁকি।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই বহুমাত্রিক প্রভাব শিশুদের শিক্ষা থেকে শুধু দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি করছে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা ও ইউনিসেফের তথ্যেও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষায় জরুরি বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা উপকূলীয় ও চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চর ও উপকূলীয় এলাকার শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এর প্রভাব তাদের শিক্ষাজীবনকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এসব শিশুর সুরক্ষায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক প্রণোদনা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

চরফ্যাশনের চরাঞ্চলে সন্ধ্যা নামলে নদীর ওপারে একে একে জ্বলে ওঠে কুপি বা বৈদ্যুতিক বাতির ক্ষীণ আলো। সেই আলোয় কোথাও হয়তো কোনো শিশু বই খুলে বসে, আবার কোথাও একই বয়সী আরেক শিশু জাল গুছিয়ে নেয় পরদিনের নদীযাত্রার জন্য। দুজনের বয়স একই, স্বপ্ন দেখার অধিকারও একই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য আর জীবনসংগ্রামের নির্মম বাস্তবতা তাদের পথকে আলাদা করে দিচ্ছে।

একদিকে বিদ্যালয়ের খাতায় ভর্তি শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বছরের শেষে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে অনেক মুখ। তাই চরফ্যাশনের চরাঞ্চলে শিশুদের স্কুলে আনা শুধু ভর্তির হিসাবের বিষয় নয়; তাদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগের মধ্যেও শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা না গেলে নদীভাঙনের সঙ্গে শুধু ঘরবাড়িই হারাবে না—হারিয়ে যেতে পারে একটি প্রজন্মের শিক্ষার স্বপ্নও।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।