সর্বশেষঃ

জলাতঙ্ক: একটি কামড়েই ঝুঁকিতে জীবন, সময়মতো চিকিৎসায় সম্ভব প্রতিরোধ

মোঃ সামিরুজ্জামান, সিনিয়ার স্টাফ রিপোর্টার

একটি ছোট্ট কামড় কিংবা সামান্য আঁচড়। আপাতদৃষ্টিতে তেমন গুরুতর কিছু মনে না হলেও এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। আক্রান্ত কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণীর কামড় থেকে ছড়িয়ে পড়া জলাতঙ্ক কেড়ে নিতে পারে মানুষের প্রাণ। অথচ সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিলে এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই জলাতঙ্কের ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা ও প্রাণীর টিকাদানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

আজ সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘Stronger Together’, যার অর্থ সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আরও শক্তিশালী। মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু। মানুষের জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রায় ৯৯ শতাংশের জন্য দায়ী কুকুর। এশিয়া ও আফ্রিকায় এ রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী। অন্যদিকে, সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশেও জলাতঙ্কের ঝুঁকি উদ্বেগজনক। মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জলাতঙ্কে ৪২ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ জনে। ২০২৫ সালে মারা যান আরও ৫৯ জন। একই সময়ে কুকুর ও বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়ের শিকার হয়ে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৩ সালে প্রায় ৯৪ হাজার মানুষ চিকিৎসা নিলেও ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এসব পরিসংখ্যান দেশে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সচেতনতা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে।

জলাতঙ্ক একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা মূলত মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। আক্রান্ত প্রাণীর লালার মাধ্যমে ভাইরাসটি সাধারণত মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। কুকুরের কামড় এ রোগ সংক্রমণের প্রধান কারণ হলেও বিড়াল, শিয়াল, বেজি ও অন্যান্য আক্রান্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর কামড় বা আঁচড় থেকেও সংক্রমণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কামড়ের ক্ষত ছোট হওয়ায় মানুষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু ক্ষত সামান্য হলেও ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি থাকে।

কামড়ের পরপরই সাধারণত জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পরও উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ সময় আক্রান্ত ব্যক্তিকে বাইরে থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হলেও শরীরের ভেতরে ভাইরাসটি স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কের দিকে অগ্রসর হতে পারে। ক্ষতের গভীরতা, অবস্থান ও ভাইরাসের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে উপসর্গ প্রকাশের সময়।

প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা ও শরীরে অস্বস্তির পাশাপাশি কামড়ের স্থানে ব্যথা, জ্বালাপোড়া কিংবা ঝিনঝিন করার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। পরবর্তী সময়ে ভাইরাস মস্তিষ্কে পৌঁছালে আক্রান্ত ব্যক্তির আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। অস্থিরতা, পানি পান করতে ভয় পাওয়া, বাতাসের সামান্য প্রবাহে অস্বস্তি, খিঁচুনি কিংবা পক্ষাঘাতের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। রোগের শেষ পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হয়ে পড়তে পারেন এবং তাঁর মৃত্যু হতে পারে।

এ বিষয়ে অট্রলিয়ার সিডিনিতে ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনি (UTS) – ফ্যাকাল্টি অব হেলথ এ কর্মরত চিকিৎসক ডা. আরাফাত হেসেন বলেন, ‘জলাতঙ্কের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগটি প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী। তাই কুকুর বা অন্য কোনো সন্দেহভাজন প্রাণী কামড়ালে কিংবা আঁচড় দিলে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। ক্ষতস্থান সাবান ও প্রবহমান পানি দিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ধুয়ে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা নিতে হবে। ক্ষতের ধরন ও ঝুঁকি বিবেচনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিনও প্রয়োজন হতে পারে। টিকার নির্ধারিত সব ডোজ সম্পন্ন করাও অত্যন্ত জরুরি।’

চিকিৎসকদের মতে, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কামড়ের পর প্রথম পদক্ষেপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষত ছোট হোক কিংবা বড়, রক্তপাত হোক কিংবা না হোক, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতস্থানে মরিচ, হলুদ, চুন কিংবা মাটি লাগানো যাবে না। এসব প্রচলিত ঘরোয়া পদ্ধতি সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় না, বরং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি করাতে পারে।

তবে জলাতঙ্ক প্রতিরোধের লড়াই শুধু হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাণীর টিকাদান, নিরাপদ আচরণ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমেও এ রোগের বিস্তার কমানো সম্ভব। বিশেষ করে পোষা কুকুর ও বিড়ালের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি পথকুকুরের টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ চিকিৎসক ও গ্রামীন জন উন্নয়ন সংস্থার অতিরিক্ত পরিচালক ড. খলিলুল রহমান   বলেন, ‘জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কুকুর ও বিড়ালের নিয়মিত টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পোষা প্রাণীর মালিকদের নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি পথকুকুরের ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে মানুষের মধ্যে এ রোগের সংক্রমণ কমানো সম্ভব। কোনো প্রাণীর আচরণ অস্বাভাবিক মনে হলে সেটির কাছাকাছি যাওয়া বা বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই অপরিচিত প্রাণীর কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার শিক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে কুকুর বা বিড়ালকে বিরক্ত করা, খাবার খাওয়ার সময় কাছে যাওয়া কিংবা ঘুমন্ত অবস্থায় স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে তাদের সচেতন করা প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্কে মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা। এ লক্ষ্য অর্জনে মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কুকুরের ব্যাপক টিকাদান, প্রয়োজনীয় টিকার সরবরাহ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই মানুষের সঙ্গে কুকুর ও বিড়ালের সহাবস্থান রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে প্রাণীর প্রতি আগ্রহ থাকায় অসতর্ক মুহূর্তে কামড় বা আঁচড়ের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে জলাতঙ্ক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ না করে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

জলাতঙ্কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সময়মতো চিকিৎসা। একটি ছোট্ট কামড় যেন কোনো পরিবারের জন্য আজীবনের শোকের কারণ না হয়, সে জন্য প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। পাশাপাশি প্রাণীর টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে এবং শিশুদের নিরাপদ আচরণ শেখাতে হবে।

জলাতঙ্ক প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। তাই সম্মিলিত সচেতনতা, নিয়মিত টিকাদান এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগে প্রাণহানি কমানো সম্ভব। একটি সচেতন সিদ্ধান্তই বাঁচাতে পারে একটি জীবন।

 

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।