সর্বশেষঃ

নজরুল ইসলাম মিয়া: শুরুর দিনের পাশে থাকা মানুষটিকে বিদায়

এ এইচ এম বজলুর রহমান::

কিছু মানুষের চলে যাওয়ার সংবাদ আমাদের নিজের জীবনের একটি সময়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। অ্যাডভোকেট এ কে এম নজরুল ইসলাম মিয়ার মৃত্যুসংবাদ আমার কাছে তেমনই এক বেদনার সংবাদ। আজ, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, চিকিৎসার জন্য ভোলা হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তিনি ছিলেন আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও লালমোহন প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি। আমার স্মৃতিতে তিনি আরও একটি পরিচয়ে অমলিন: লালমোহনে আমার সাংবাদিকতা এবং প্রেসক্লাব গড়ে তোলার শুরুর দিনগুলোর একজন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তাঁর কথা মনে পড়তেই ফিরে যাচ্ছি ১৯৮৪ সালে। তখন ভোলা দ্বীপের লালমোহন উপজেলায় সাংবাদিকতা করি। স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি ঠিকানা গড়ে তোলার উদ্যোগ আমাদের কাছে ছিল অনেক প্রত্যাশার বিষয়। একটি প্রেসক্লাব মানে শুধু বসার জায়গা নয়; নিজেদের কাজ নিয়ে কথা বলা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সংবাদকর্মী হিসেবে একসঙ্গে পথ চলার একটি অবলম্বন। সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের সঙ্গে নজরুল ইসলাম মিয়ার সহযোগিতার স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

লালমোহন প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন আমার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক, বিএ, বিএড। শিক্ষকের নেতৃত্বে এমন একটি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারা আমার জীবনের মূল্যবান অভিজ্ঞতা। শিক্ষক ও সাংবাদিকতার জগৎ তখন একটি প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নকে ঘিরে এক হয়েছিল। আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, আমাদের জীবনের বড় অর্জনগুলোর পেছনে প্রায়ই এমন কিছু মানুষের অবদান থাকে, যাঁদের সহায়তা ছাড়া প্রথম পদক্ষেপটিই নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।

লালমোহনের পরিত্যক্ত হাসপাতালের একটি বড় কক্ষে প্রেসক্লাবের কার্যক্রমের জায়গা হয়েছিল। সেই ঘরেই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পথচলার সূচনা। সেখানে প্রেসক্লাব গড়ে তুলতে নজরুল ইসলাম মিয়া আমাকে যে সহযোগিতা করেছিলেন, তা আজ গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি। তাঁর সহযোগিতা ছাড়া ওই জায়গায় প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। এটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা, জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্বীকারোক্তি।

এখন সেই বড় ঘরটির কথা ভাবলে প্রতিষ্ঠানের শুরুর সময়ের মানুষগুলোর কথাও মনে পড়ে। কোনো সংগঠনের ইতিহাসে প্রতিষ্ঠার সালটি লেখা থাকে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠাকে সম্ভব করতে কে কখন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, কার সহযোগিতায় একটি বাধা পেরোনো গিয়েছিল, সেসব সব সময় লেখা থাকে না। নজরুল ইসলাম মিয়ার বিদায়ের দিনে মনে হচ্ছে, এই স্মৃতিটুকু লিখে রাখা আমার দায়িত্ব। ভবিষ্যতের সহকর্মীদেরও জানা প্রয়োজন, শুরুর পথটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে তিনি আইন পেশা ও রাজনীতিতে যুক্ত হন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। ফলে সেই জীবন নিয়ে মূল্যায়ন করার দাবি আমার নেই। তাঁকে আমি স্মরণ করছি আমাদের পরিচয়, তাঁর সহযোগিতা এবং আমার সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর আন্তরিক সমর্থনের জায়গা থেকে। একজন মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর সঙ্গে সব ক্ষেত্রে পথ চলার প্রয়োজন হয় না। নিজের অভিজ্ঞতায় পাওয়া তাঁর অবদানটুকু সৎভাবে মনে রাখাও শ্রদ্ধার একটি অর্থপূর্ণ প্রকাশ।

লালমোহনে আমার আপসহীন সাংবাদিকতা তিনি পছন্দ করতেন। এই স্মৃতিটি আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে। সাংবাদিকতার পথে নিজের অবস্থানে অটল থাকার চেষ্টাকে কেউ সম্মান করলে তা মনে সাহস জোগায়। তাঁর সেই ভালো লাগা আমার কাছে মূল্যবান ছিল। এত বছর পরও কথাটি স্মরণ করতে পারছি, কারণ কাজের প্রতি মানুষের আন্তরিক স্বীকৃতি অনেক সময় দীর্ঘদিন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।

১৯৮৫ সালের শেষ দিকে আমি ধীরে ধীরে ভোলা জেলা সদরে চলে আসি। এরপর সময়ের ব্যবধানে যোগাযোগের ঘনত্ব কমতে থাকে। বরিশাল ও ঢাকায়ও আগের মতো নিয়মিত যোগাযোগ আর থাকেনি। জীবনের এই দূরত্ব বড় নীরব। কোনো আনুষ্ঠানিক বিদায় থাকে না, অথচ একসময় বুঝতে পারি, দীর্ঘদিন কথা হয়নি। আজ তাঁর মৃত্যুসংবাদ সেই ব্যবধানটিকেও বেদনার সঙ্গে মনে করিয়ে দিল।

তাঁর পরিবারের শোকের গভীরতা কোনো সমবেদনার বাক্যে ধরা সম্ভব নয়। তবু তাঁদের জানাতে চাই, তাঁদের আপনজনকে আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখব। লালমোহন প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার স্মৃতিতে তাঁর সহযোগিতার কথা আমার কাছে অমলিন থাকবে। একজন মানুষের অনুপস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন; তাঁর অবদান স্মরণ করা সেই শোক বহনের একটি উপায়।

মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।

নজরুল ইসলাম মিয়া, শুরুর দিনের সেই সহযোগিতার জন্য আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইল। বিদায়।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।