সর্বশেষঃ

৬৪ বছরেও অডিটোরিয়াম পায়নি ভোলা সরকারি কলেজ, প্যান্ডেলেই বড় আয়োজন

একটি প্রতিষ্ঠানের বয়স যখন ছয় দশক পেরিয়ে যায়, তখন তার দেয়ালে জমে থাকার কথা সময়ের গৌরব, অর্জন আর অগ্রগতির গল্প। কিন্তু ভোলা সরকারি কলেজের গল্পে আজও রয়ে গেছে এক অদৃশ্য অপূর্ণতা। হাজারো শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর এই বিদ্যাপীঠে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম যেন দীর্ঘদিনের অপেক্ষার নাম। প্রতিষ্ঠার ৬৪ বছরেও সেই অপেক্ষার অবসান হয়নি। ফলে জাতীয় দিবস থেকে শুরু করে নবীনবরণ, বিদায় সংবর্ধনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশ—বড় কোনো আয়োজন এলেই কলেজের মাঠে ভরসা করতে হয় অস্থায়ী প্যান্ডেলের ওপর।

কখনো তীব্র রোদের নিচে, কখনো মেঘ-বৃষ্টির শঙ্কা মাথায় নিয়ে আয়োজন করতে হয় শিক্ষার্থীদের প্রিয় অনুষ্ঠানগুলো। আকাশে মেঘ জমলেই আয়োজকদের চোখ চলে যায় প্যান্ডেলের দিকে। বৃষ্টি নামলে অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে শেষ হবে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয় উৎকণ্ঠা। আবার প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় খোলা মাঠে বসে থাকতে হয় শিক্ষার্থীদের। একটি স্থায়ী অডিটোরিয়ামের অভাবে আনন্দের আয়োজনেও তাই মিশে থাকে অনিশ্চয়তা ও বিড়ম্বনা।

দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভোলা সরকারি কলেজ। দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি উচ্চমাধ্যমিক থেকে শুরু করে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তৃত করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও একাডেমিক কার্যক্রম যত বেড়েছে, সেই অনুপাতে বাড়েনি প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো। বিশেষ করে একটি আধুনিক ও পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অডিটোরিয়ামের অভাব এখন কলেজটির অন্যতম বড় অবকাঠামোগত সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কলেজ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৬২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ভোলা পৌরসভার যুগীরঘোল-সংলগ্ন ভোলা-চরফ্যাশন আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে প্রতিষ্ঠিত হয় ভোলা সরকারি কলেজ। পরে ১৯৭৯ সালের ৭ মে কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ চালু রয়েছে। পাশাপাশি ১৬টি বিষয়ে অনার্স এবং ১৪টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স পরিচালিত হচ্ছে।

কলেজের তথ্যমতে, বর্তমানে এখানে ৯ হাজার ১৭২ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এর মধ্যে ছাত্র ৫ হাজার ৫৪৭ জন এবং ছাত্রী ৩ হাজার ৬৯৫ জন। এ ছাড়া ৫২ জন শিক্ষক ও ৪৩ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তবে ছাত্র ও ছাত্রীর পৃথক সংখ্যার যোগফলের সঙ্গে মোট শিক্ষার্থীসংখ্যার সামান্য অসঙ্গতি রয়েছে। প্রকাশের আগে কলেজের সর্বশেষ অফিসিয়াল নথি থেকে সংখ্যাটি পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন।

এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের একাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় দিবসের কর্মসূচি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞান মেলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়াম, অভিভাবক সমাবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী মতবিনিময়, নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন, বিদায় ও সংবর্ধনা—সব আয়োজনের ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় একটি উপযুক্ত মিলনায়তনের। অথচ সেই প্রয়োজন মেটানোর মতো কোনো স্থায়ী অডিটোরিয়াম নেই।

ফলে বড় কোনো অনুষ্ঠান সামনে এলেই শুরু হয় অস্থায়ী প্যান্ডেল তৈরির প্রস্তুতি। মাঠ পরিষ্কার করা, প্যান্ডেল নির্মাণ, মঞ্চ তৈরি, চেয়ার বসানো, সাউন্ড সিস্টেম, আলো ও প্রজেক্টরের ব্যবস্থা—সবকিছুতেই বাড়তি অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। তারপরও নিশ্চয়তা থাকে না অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে শেষ হবে কি না। প্রকৃতির সামান্য বিরূপতাই কখনো কখনো পুরো আয়োজনকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

শুধু আবহাওয়াই নয়, খোলা জায়গায় বড় আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকে আরও নানা সীমাবদ্ধতা। পর্যাপ্ত শব্দব্যবস্থা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। পেছনের সারিতে থাকা অনেক শিক্ষার্থী বক্তার বক্তব্য স্পষ্টভাবে শুনতে পারেন না। মঞ্চের উপস্থাপনাও সবার কাছে সমানভাবে দৃশ্যমান হয় না। প্রজেক্টর কিংবা মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও তৈরি হয় নানা কারিগরি জটিলতা। ফলে একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে ধরনের জ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক আয়োজন হওয়ার কথা, জায়গার সীমাবদ্ধতায় তার অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়।

ভোলা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মেসকাত আহমেদ, আব্দুল্লাহ আল তুহিন, হাসনাইন ইসলাম ও তুষি বলেন, অডিটোরিয়াম না থাকায় কলেজ প্রশাসনের আয়োজনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সেমিনারও খোলা মাঠে করতে হয়। বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেক সময় পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান ব্যাহত হয়। বড় আয়োজন হলে পর্যাপ্ত সাউন্ড, প্রজেক্টর ও আলোর ব্যবস্থাও করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাদের মতে, কলেজের সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একসঙ্গে সেমিনার, ক্যারিয়ার ওয়ার্কশপ কিংবা বিশিষ্ট অতিথিদের নিয়ে আলোচনা আয়োজনের জন্য একটি স্থায়ী অডিটোরিয়াম অত্যন্ত প্রয়োজন। একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা নয়, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সৃজনশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। তাই দ্রুত কলেজে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভোলা সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রভাষক মো. এমরান হোসেন বলেন, একটি আধুনিক ও পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতাসম্পন্ন অডিটোরিয়ামের অভাব কলেজের একাডেমিক, সাংস্কৃতিক, সহশিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক বিকাশে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, প্রতিবছর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সেমিনার, কর্মশালা, বিজ্ঞান মেলা, সিম্পোজিয়াম, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, অভিভাবক সমাবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমাবেশ, মতবিনিময় সভা, নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন, বিদায় ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসের কর্মসূচি আয়োজন করতে হয়। কিন্তু এসব অনুষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান না থাকায় কলেজ প্রশাসনকে প্রতিবারই বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হয়।

এমরান হোসেন আরও বলেন, কলেজের শ্রেণিকক্ষগুলো মূলত পাঠদানের জন্য নির্মিত হওয়ায় বড় কোনো সভা বা সমাবেশ আয়োজনের উপযুক্ত জায়গা নেই। ফলে অস্থায়ী প্যান্ডেল ব্যবহার করতে হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয়ের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত জটিলতাও তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এসব আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রকৃতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করতে হয়। বৃষ্টি, ঝড় কিংবা অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রতিবছরই কিছু অনুষ্ঠান ব্যাহত হয়। অডিটোরিয়াম থাকলে বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষা ও অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষাও সহজে আয়োজন করা সম্ভব হতো।

দীর্ঘদিনের এই সংকটের কথা স্বীকার করে ভোলা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. ইসরাফীল বলেন, একটি আধুনিক অডিটোরিয়ামের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরে একাধিকবার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিত প্রস্তাব ও আবেদন পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এ-সংক্রান্ত ফাইল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে রয়েছে।

অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশ এবং প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক পরিবেশ সমুন্নত রাখতে ভোলা সরকারি কলেজে দ্রুত একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম প্রয়োজন। এটি কলেজের দীর্ঘদিনের দাবি।

ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ভোলা সরকারি কলেজ জ্ঞান ও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ পেরিয়ে জীবনের নানা ক্ষেত্রে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে বদলেছে শিক্ষার ধরন, বেড়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিস্তৃত হয়েছে একাডেমিক কার্যক্রম। বদলেছে চারপাশের অনেক কিছুই। শুধু বদলায়নি একটি অপেক্ষার দৃশ্য—বড় কোনো আয়োজন এলেই এখনো মাঠে প্যান্ডেল ওঠে।

যে তরুণেরা আধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে এই বিদ্যাপীঠে আসেন, তাঁদের জন্য একটি নিরাপদ, স্থায়ী ও আধুনিক মিলনায়তন এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং সময়ের প্রয়োজন। ৬৪ বছরের পুরোনো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে একটি অডিটোরিয়াম নির্মাণ হলে শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের একটি স্থানই তৈরি হবে না, বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার জন্য তৈরি হবে একটি স্থায়ী পরিসর।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।