ভোলার গ্যাসে সিদ্ধান্তহীনতা, বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

মো: সামিরুজ্জামান, সিনিয়ার স্টাফ রিপোর্টার
দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার একদিকে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে বাড়ানো হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দ্বীপ জেলা ভোলার গ্যাস এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে পাইপলাইন নির্মাণের আলোচনা চললেও এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না ভোলার গ্যাস।
ভোলার গ্যাস নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে নানা পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা এবং বরিশাল থেকে ঢাকায় পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর মধ্যে সময়ের সঙ্গে পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয়ও কয়েক গুণ বেড়েছে। ফলে যে প্রকল্প একসময় তুলনামূলক কম ব্যয়ে বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল, এখন সেটি করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
ভোলায় নব্বইয়ের দশকে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। বর্তমানে সেখানে শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও সুন্দরপুর নামে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এসব গ্যাসক্ষেত্রে সম্ভাব্য মজুত প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বা ২ টিসিএফ। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ২ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলনযোগ্য হতে পারে। বাপেক্সের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উৎপাদনে থাকা কূপগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। তবে বাস্তবে উত্তোলন করা হচ্ছে প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
ভোলায় উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে আরও ১০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি কূপ একটি চীনা কোম্পানি এবং পাঁচটি কূপ বাপেক্স খনন করবে। নতুন কূপ থেকে উৎপাদন শুরু হলে ভোলার গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। তবে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এই গ্যাস কীভাবে জাতীয় গ্রিড ও দেশের শিল্পাঞ্চলে নেওয়া হবে, সেই প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নেওয়ার আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। প্রায় ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে পরিকল্পনা হয়েছে। ২০১৮ সালে ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত প্রায় ১০২ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইনটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনের পরিকল্পনা ছিল। পাইপলাইনটির প্রস্তাবিত পরিবহন সক্ষমতা একটি বড় এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ সক্ষমতার কাছাকাছি হলেও শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এখন একই ধরনের পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। মূল্যস্ফীতি, আমদানি করা যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি, পরামর্শক ব্যয় ও জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যে প্রকল্প একসময় প্রায় ৬০০ কোটি টাকায় বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেটি এখন বাস্তবায়ন করতে অন্তত সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কিছু হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের পরিধি ও ব্যয়ের ধরন অনুযায়ী তা আরও বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে দেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একটি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে গ্যাস খাতে সরকারকে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। বিপুল এই ব্যয়ের পরও দেশে গ্যাসের সংকট পুরোপুরি কমেনি।
জাতীয় গ্রিডে সরাসরি যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ভোলার গ্যাস এতদিন মূলত স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আবাসিক সংযোগে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমানে ভোলায় ২২৫ মেগাওয়াট ও ২২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। তবে এখন বিকল্প পদ্ধতিতে ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নেওয়ার উদ্যোগও শুরু হয়েছে। সিএনজি আকারে বিশেষ বার্জ ও ট্যাংকারে করে এই গ্যাস ঢাকার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার আশপাশের প্রায় ৩০টি শিল্পকারখানায় ভোলার গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৭টি কাভার্ড ট্যাংকারে করে ভোলা থেকে গ্যাস নেওয়া হচ্ছে। এতে দৈনিক প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ ৫০ লাখ ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস নেওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও ট্যাংকার সংকটের কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতিদিন ভোলা থেকে প্রায় আড়াই থেকে তিন মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঢাকায় যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপনায় এই গ্যাস শিল্পকারখানায় পৌঁছানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চাহিদা থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নিয়মিতভাবে সর্বোচ্চ পরিমাণ গ্যাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে ভোলার গ্যাসকে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে কাজে লাগাতে সরকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলে জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। এর আওতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভোলায় একটি শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুধু ভোলার অর্থনীতি নয়, দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ভোলার গ্যাস নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানিয়েছেন, ভোলাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্ত করার পাশাপাশি সেখানে ৫০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে একটি ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ভোলায় বিনিয়োগে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সেখানে শিল্পকারখানা গড়ে তুলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভোলার গ্যাস স্থানীয় শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার কারখানায় ব্যবহারের পাশাপাশি পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল ভূখণ্ডেও নেওয়া হবে। এ জন্য পাইপলাইন নির্মাণে প্রায় সাত বছর সময় প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবে দীর্ঘদিন ধরে নানা পরিকল্পনার কথা বলা হলেও ভোলার গ্যাস নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক (পরিকল্পনা) মো. আব্দুল মান্নান পাটওয়ারী। তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি কোনো কিছু এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
পেট্রোবাংলার একটি সূত্র জানিয়েছে, পাইপলাইনের পাশাপাশি এলএনজি আকারে ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হতে পারে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার ব্যয়ও কমানো জরুরি। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ব্যয় না কমালে জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে। বিদ্যমান ব্যয় কমানোর উদ্যোগ ছাড়া শুধু ব্যয় বাড়িয়ে জ্বালানি সমস্যার সমাধান করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ভোলার গ্যাসের ক্ষেত্রে এখন তাই মূল প্রশ্ন শুধু মাটির নিচে কত গ্যাস রয়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই গ্যাস কত দ্রুত এবং কতটা সাশ্রয়ী উপায়ে দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে ব্যবহার করা যাবে। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরও যদি পাইপলাইন নির্মাণের মতো মৌলিক অবকাঠামোর সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে, তাহলে উৎপাদন বাড়লেও তার পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে। একই সময়ে এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় অব্যাহত থাকলে দেশীয় গ্যাসের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তাও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
