ভোলার পার্থসহ শপথ নেওয়া ৬ মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী কে কোন দায়িত্ব পেলেন
জোটের শরিক থেকে মন্ত্রিসভায় পার্থ, ভোলায় আনন্দ মিছিল

মোঃ সামিরুজ্জামান/মোঃ হাসনাইন আহমেদ ॥
জোটের শরিক দল থেকে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তার মন্ত্রিত্বের খবরে ভোলায় আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন নেতাকর্মীরা। শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে নতুন মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন ভোলা-১ আসনের এই সংসদ সদস্য। পার্থ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। মন্ত্রিত্ব পাওয়ায় ভোলার উন্নয়নে এবার তিনি ভূমিকা রাখবেন-এমন প্রত্যাশা ভোলাবাসীর। বিশেষ করে ভোলা-বরিশাল সেতু, নদীভাঙন রোধ, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
জেলা বিজেপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রতন বলেন, বহুদিনের স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হয়েছে। পার্থ মন্ত্রী হওয়ায় আমরা আনন্দিত। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ভোলা জেলা বিজেপির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
জেলা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক মেতাসিন বিল্লাহ বলেন, এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের দিন। আমাদের নেতা দীর্ঘ ১৭ বছর যে ত্যাগ, আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছেন, তার পর আজকের এই অর্জন এসেছে। এ জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।
এদিকে পার্থর মন্ত্রী হওয়ার খবরে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও তাঁকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। তাঁর মা রেবা রহমানকেও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অনেকে। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর মা রেবা রহমান ভোলার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পার্থর প্রয়াত বাবা, সাবেক মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জু’র জন্য সবার কাছে দোয়া চাওয়া হয়েছে। পরিবারের প্রত্যাশা, বাবার মতোই পার্থ ভোলার মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে জেলার মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন।
পারিবারিকভাবেই রাজনীতিতে :
পারিবারিকভাবেই রাজনীতিতে আসেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তার বাবা মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জু জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রভাবশালী মন্ত্রী, মেয়র ও নেতা ছিলেন। মা শেখ রেবা রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নি। মা-বাবার পছন্দের আলোকে বিয়েও করেছেন আওয়ামী পরিবারে। দেশ-বিদেশে পড়াশোনা শেষে ২০০৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর বাবার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির হাল ধরেন পার্থ। ওই বছরই বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সংসদ সদস্য প্রার্থী হন ভোলা-১ আসন থেকে। আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
সংসদে তারুণ্যের আইকন হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা রেখে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় আসেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ভোলার উন্নয়নে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি-এমন আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিশেষ করে ভোলার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও নদীভাঙন রোধে তার তেমন কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর চলতি বছরের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিত্ব পাওয়ায় ভোলায় ব্যাপক আনন্দ-আলোচনা চলছে। অতীতের সব গ্লানি মুছে ভোলার উন্নয়নে এবার তিনি ব্যাপক ভূমিকা রাখবেন—এমন প্রত্যাশা ভোলাবাসীর।
সংসদে তুখোড় বক্তা হিসেবে পরিচিতি :
২০০৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর বাবার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির হাল ধরেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। ওই বছর বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট থেকে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে হারিয়ে ভোলা-১ আসন থেকে তরুণ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তিনি পেয়েছিলেন ৫৩ শতাংশ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন ৪৩ শতাংশ ভোট। বলা চলে, তিনি আওয়ামী লীগের আরেক বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কারণ তখন এমন অবস্থা ছিল যে তোফায়েল আহমেদের বাহিরে ভোলায় কিছু হওয়া বা করা অসম্ভব—এমনটাই মনে করতেন অনেকে। যার কারণে দুই বর্ষীয়ান নেতার সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন তিনি।
এরপর সংসদে তুখোড় বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে দেশ-বিদেশে আলোচনায় আসেন। টিভি, টকশো ও আলোচনায় তুখোড় বক্তা হিসেবে সমাদৃত হন তিনি। পৈতৃক প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং মাতৃক ও বৈবাহিক রাজনৈতিক আধিপত্য থাকায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কোনো বিষয়েই তাকে পিছুটানে পড়তে হয়নি।
লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি, ধান্দা ও টেন্ডারবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়ে ক্লিন ইমেজের পরিচয় ফুটে ওঠে রাজনৈতিক মাঠে। স্মার্ট চলাফেরা ও স্বচ্ছ রাজনীতির কারণে বিএনপির ঘনিষ্ঠ সহচর হয়ে ওঠেন তিনি। তরুণ বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন সর্বত্র। অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় বিএনপির চেয়ারপারসন মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার স্নেহের সুদৃষ্টিতে আসেন এই তরুণ রাজনীতিবিদ। কারণ তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি পছন্দ করতেন।
এরপর আর পেছনে ফিরতে হয়নি তরুণ এই রাজনীতিবিদকে। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিরোধী রাজনীতিতে থেকে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আরও বেশি আলোচিত হন তিনি। ২০১৪ সালে বিএনপি জোটের নির্বাচন বর্জনে তিনি জোটের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একই ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী শাসনামলে মায়ের গোষ্ঠীর নেতৃত্ব থাকলেও তিনি তা পরোয়া না করে নিজের ভূমিকায় থেকে জেলও খেটেছেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ।
দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য, এবার মন্ত্রী :
২০২৬ সালে আবার বিএনপির টিকিট নিয়েই ভোলা-১ আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো প্রায় ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পরপরই ভোলাবাসী আশা করেছিল, মন্ত্রী হবেন তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক অনেক সমীকরণের কারণে একটু পরে হলেও মন্ত্রী হওয়ায় খুশি ভোলাবাসী।
মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে ভোলার রাজনীতিতে পার্থর ভূমিকার পরিধি আরও বাড়ল। নতুন দায়িত্বে তিনি জেলার দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-দাবি ও নাগরিক সমস্যাগুলো জাতীয় পর্যায়ে সমাধানে এগিয়ে আসবেন বলে আশা করছেন ভোলার মানুষ।
