মনপুরায় সংবাদ সংগ্রহের সময় দুই তরুণ সাংবাদিকের ওপর হামলা, ক্যামেরা-মোবাইল ভাঙচুর

ভোলার মনপুরায় অসহায় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জমি দখল করে অবৈধভাবে ঘাস বিক্রির অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার বিচ্ছিন্ন চর কলাতলী ইউনিয়নের কবির বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
হামলায় আহত সাংবাদিকরা হলেন দৈনিক তৃতীয় মাত্রা ও সকালের সময়-এর উপজেলা প্রতিনিধি মেহেদী হাসান এবং দৈনিক ভোলার বাণী ও দৈনিক জনবানীর সাংবাদিক আবদুর রহমান শোয়েব।
আহত সাংবাদিকদের অভিযোগ, চর কলাতলী এলাকায় ভূমিহীন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জমি দখল এবং ওই জমিতে উৎপাদিত ঘাস বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় খালেকের নেতৃত্বে একদল লোক তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। একপর্যায়ে তাঁদের মারধর করে আহত করা হয়। এ সময় সঙ্গে থাকা ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ভাঙচুর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, মো. খালেক, হানিফ ও শাহেদসহ কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিপুল পরিমাণ জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তাঁদের দাবি, প্রায় ১ হাজার ১৭০ একর জমি দখলে নিয়ে সেখানে উৎপাদিত ঘাস স্থানীয় মহিষপালকদের কাছে বিক্রি করে অর্থ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জমিগুলোর প্রকৃত মালিকদের অনেকে নিজেদের জমিতে যেতে পারছেন না। জমিতে চাষাবাদ কিংবা গবাদিপশু চরাতেও বাধার মুখে পড়ছেন তাঁরা। জমির দখল নিয়ে বিরোধের কারণে এলাকায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলেও দাবি তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দা রাজবি বলেন, “গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত আমি আমার জমি ভোগদখল করতে পারছি না। খালেক আমার জমি দখল করে ঘাস বিক্রি করে ফেলেছেন। এখন আমরা জমিতে চাষ করতে পারি না। আমাদের জমি থেকে ঘাস বিক্রি করা হলেও কোনো টাকা দেওয়া হয়নি।”
আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, তিনিও নিজের জমি ভোগদখল করতে পারছেন না। তাঁর অভিযোগ, জমির ঘাস বিক্রি করা হলেও প্রকৃত মালিকদের কোনো অর্থ দেওয়া হচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জমির মালিকদের অনুমতি ছাড়াই জমিতে থাকা ঘাস কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে জমির মালিকরা একদিকে জমির নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন, অন্যদিকে জমি থেকে পাওয়া অর্থও পাচ্ছেন না।
জমি দখল ও ঘাস বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক আবদুর রহমান শোয়েব ও মেহেদী হাসানের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
আহত সাংবাদিকরা জানান, সংবাদ সংগ্রহের সময় তাঁদের ওপর আকস্মিকভাবে হামলা চালানো হয়। এতে তাঁরা শারীরিকভাবে আহত হন। চর কলাতলী থেকে ফিরে তাঁরা এ ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান।
তাঁদের আরও অভিযোগ, ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হামলাকারীদের পক্ষ নিয়ে একটি মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।
দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভোলা জেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক ও সময় টেলিভিশনের ভোলা প্রতিনিধি নাছির লিটন, দৈনিক ভোলার বাণী পরিবার, দৈনিক বাংলার কণ্ঠ পরিবার, ভোলা মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, এনটিভি অনলাইন ও বাংলাদেশ বেতারের প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিয়াজ, সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোলার বাণী ও ভোলা পোস্টের সম্পাদক মো. সোহেল এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাংলা টিভির ডিজিটাল প্রতিনিধি মো. হাসনাইন আহাম্মেদসহ সংগঠনের সব সদস্য।
এ ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন মনপুরা প্রেসক্লাবের সভাপতি অহিদুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক সীমান্ত হেলাল, মনপুরা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মহিবুল্লাহ ইলিয়াসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
মনপুরা প্রেসক্লাবের সভাপতি অহিদুর রহমান বলেন, “সাংবাদিকদের ওপর হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”
তিনি বলেন, “সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো অভিযোগ বা অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
মনপুরা উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুল খালেক সেলিম মোল্লা বলেন, “অপরাধী কোনো দলের হতে পারে না। অভিযুক্ত খালেক আমাদের দলের নাম ভাঙিয়ে এ ধরনের অপরাধ করার কোনো সুযোগ নেই। আমরাও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
তিনি আরও বলেন, “কেউ দলের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জমি দখল, হয়রানি কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে তার দায় দল নেবে না।”
স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জমির মালিকানা ও দখলের বিষয়টি প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অনুমতি ছাড়া ঘাস কেটে বিক্রি করা হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের বিষয়েও তদন্তের দাবি করেছেন তাঁরা।
অন্যদিকে, সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।
তবে জমি দখল, ঘাস বিক্রি এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মো. খালেক, হানিফ ও শাহেদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এ বিষয়ে মনপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজাহারুল ইসলাম বলেন, দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার খবর তিনি শুনেছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
