সর্বশেষঃ

তিন সেতু বদলে দেবে ৩৩ জেলার ভাগ্য

বরিশাল, শরীয়তপুর ও ভোলায় মেঘনা নদীর তিন পয়েন্টে তিনটি সেতু নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়া কেনসেটসু কনস্ট্রাকশন। প্রাথমিক সমীক্ষার পর এগুলো পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) পদ্ধতিতে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে দুটির বিষয়ে সম্প্রতি ঢাকায় জাপানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। আরেকটির বিষয়েও কথাবার্তা চলছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এগুলো নির্মিত হলে দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ৩৩ জেলার অর্থনীতির চিত্র বদলে যাবে। খুলনা-বরিশালের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ হবে চট্টগ্রামের। এতে দূরত্ব কমবে ১শ কিলোমিটার। বর্তমানে এই যোগাযোগ হয় রাজধানী ঢাকা হয়ে। তবে সেতু হলে যানবাহনগুলো সরাসরি যাতায়াত করবে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামে। এতে রাজধানীর ওপর গাড়ির চাপও কমবে।

পিপিপি পদ্ধতিতে সেতু করবে জাপান : পিপিপি পদ্ধতিতে দুটি সেতু নির্মাণের বিষয় নিয়ে জুলাইয়ের শেষদিকে ঢাকায় বৈঠক করেছেন জাপান ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। এর একটি হবে শরীয়তপুর ও চাঁদপুরের মধ্যবর্তী মেঘনায় ও অপরটি ভোলা-বরিশালে।

ওই বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, পিপিপি কর্তৃপক্ষের সিইও আশিক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম আর জাপানের পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত উনো ইয়োশিমাসা, জাপানের ভূমি, অবকাঠামো পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সহকারী উপমন্ত্রী ফুজিতা মাসাকুনি এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলবিষয়ক সহকারী উপমন্ত্রী নাকায়মা রেইকো। বাংলাদেশ-জাপান যৌথ প্ল্যাটফর্মের এই বৈঠকে দুই সেতু নির্মাণের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্তির পর আশিক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মানসম্মত বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।’

জাপানি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মিয়াগাওয়ার বাংলাদেশি অংশীদার স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহিম আহম্মেদ বলেন, ‘প্রথমে ট্রানজিশন পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হবে। এরপর সরকার রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) ইস্যু করবে। এটি জমা হওয়ার পর মূল্যায়ন শেষে নির্মাণসংক্রান্ত চুক্তি হবে। এছাড়া মেঘনার ভোলা-লক্ষ্মীপুর পয়েন্টেও একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়াগাওয়া সেটির বিষয়েও আগ্রহী।’ এর ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার সেতু সচিব মোহাম্মদ আব্দুর রউফের সঙ্গে বৈঠক করেন মিয়াগাওয়ার তোজি নিশিদা ও স্ট্যালিয়নের সাঈদ ইব্রাহিম।

দুই সেতুর সম্ভাব্য ব্যয় ৩৩ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা : প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশালের মধ্যকার সেতুর দৈর্ঘ্য ১০ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্মাণ হলে এটি হবে দেশের দীর্ঘতম সেতু। এতে ব্যয় ধরা হচ্ছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। এছাড়া ১৫ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হবে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু নির্মাণে।

সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩২ সালের মধ্যে শরীয়তপুর-চাঁদপুর এবং ২০৩৩ সাল নাগাদ ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে সেতু বিভাগ।

স্ট্যালিয়ন ক্যাপিটালের চেয়ারম্যান সাঈদ ইব্রাহিম বলেন, ‘ভোলা-বরিশাল সেতু কেবল একটি পরিবহণ প্রকল্প নয়, এটি সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে।’ ভোলা-লক্ষ্মীপুর সেতু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তৃতীয় এই সেতুটি হলে খুলনা বা মোংলা থেকে বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর হয়ে সরাসরি সড়কপথে যাওয়া যাবে চট্টগ্রাম। এতে খুলনা-চট্টগ্রামের দূরত্ব কমবে ১৩০ কিলোমিটার। যানবাহনগুলোকে তখন আর ঢাকা বা অন্য কোথাও ঘুরে চট্টগ্রামে যেতে হবে না।

গতি আসবে অর্থনীতিতে, ভাগ্য ফিরবে ৩৩ জেলার মানুষের : বর্তমানে বরিশাল থেকে চট্টগামে যেতে ঢাকা ঘুরতে হয়। এক্ষেত্রে পাড়ি দিতে হয় ১৬০ কিলোমিটার বাড়তি পথ। শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু হলে বরিশাল থেকে চট্টগ্রাম যাতায়াতে সময় লাগবে ১১-১২ ঘণ্টা থেকে কমে ৭-৮ ঘণ্টা।

বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘শিল্প-বাণিজ্যের বহু পণ্যসামগ্রী চট্টগ্রাম থেকে আসে বরিশালের ৬ জেলায়। বর্তমানে সড়ক ও নদীপথে এসব পণ্য আনতে যে সময় আর অর্থ ব্যয় হয় তাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। শরীয়তপুর-চাঁদপুর সেতু হলে এই দুটোই কমবে।’ বাপেক্সের ভোলা অঞ্চলের প্রকল্প পরিচালক আনসারুল আমিন বলেন, ‘ভোলায় এরই মধ্যে ৯টি গ্যাসকূপ খনন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি কূপ থেকে চলছে গ্যাস উত্তোলন। ভোলা-বরিশাল সেতু হলে এর মাধ্যমে পাইপলাইন বসিয়ে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।’

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এবায়েদুল হক চাঁন বলেন, ‘পদ্মার দক্ষিণপারের খুলনা-বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের ২২ জেলার সঙ্গে চট্টগ্রামের ১১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ গত ৫৫ বছরেও হয়নি। এই ৩৩ জেলার মানুষকে যুগ যুগ ধরে ফেরি পার বা ঢাকা ঘুরে একে অপরের কাছে পৌঁছাতে হয়েছে। এই তিন সেতু হলে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি দেশের পূর্ব-দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গতি আসবে।’

নৌপরিবহণ ও সেতু প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, পিপিপির ভিত্তিতে তিনটি সেতু নির্মাণের আলোচনা চলছে। আশা করি খুব শিগগিরই একটা ভালো খবর দিতে পারব। সেতু তিনটি হলে ৩৩ জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিপ্লব আসবে। বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।