সর্বশেষঃ

মিথ্যা মামলায় নাটকীয় মোড়: প্রকাশ্যে বাদীকে শাসালেন ১ নম্বর সাক্ষী!

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার দুই মৌজার সীমানা বিরোধকে পুঁজি করে এক কৃষক পরিবারকে হয়রানি ও মিথ্যা তথ্যে সাজানো মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রবহমান নদীকে ‘মাছের খামার’ দাবি করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলা, কলাগাছ কাটা ও নগদ টাকা ছিনতাইয়ের এজাহার দেওয়া হলেও অনুসন্ধানে মিলেছে ভিন্ন চিত্র। সরেজমিন তদন্তে ঘটনার আদ্যোপান্ত ও বাদীর বক্তব্যের তীব্র অসঙ্গতি বেরিয়ে এসেছে, যেখানে প্রকাশ্যে মামলার বাদীকে শাসাতে দেখা গেছে মূল অনুঘটক ১ নম্বর সাক্ষীকে।

‎গত ৬ আগস্ট ভোলা জেলার দক্ষিণ আইচা থানায় মামলাটি দায়ের করেন চর মানিকা ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম। মামলা নম্বর জিআর ৯৫/২০২৬ (দক্ষিণ)। এতে উত্তর চর মানিকা ও চর নুরুদ্দীন এলাকার নারী-পুরুষসহ মোট ১৪ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।

‎অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ‘চর নুরুদ্দীন’ ও ‘উত্তর চর মানিকা’ মৌজার সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। বিরোধীয় এই ভূখণ্ডকে চর নুরুদ্দীন মৌজার অংশ দাবি করে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতেই মামলাটির আশ্রয় নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

‎এজাহারে বাদী দাবি করেন, বিবাদীরা তার মাছের খামারে তাণ্ডব চালিয়ে কলাগাছ কাটা, মাছ চুরি এবং নগদ ৭০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। তবে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে কলাগাছ কাটা কিংবা খামার ভাঙচুরের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বাদীর ঘাড়ের বাম পাশে সামান্য আঘাতের চিহ্ন থাকলেও বর্ণিত অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার মিল মেলেনি।

‎সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে তথাকথিত ‘মাছের খামার’ অনুসন্ধানে। বাদী যেটিকে খামার দাবি করেছেন, সেটি মূলত আদিকাল থেকে স্বীকৃত প্রবহমান ‘বুড়াগৌরাঙ্গ নদী’। প্রায় পাঁচ বছর আগে নদীটিতে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে অবৈধভাবে মাছের ঘেরে পরিণত করা হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, ঘেরের পূর্ব-দক্ষিণ পাশের পাড় কেটে প্রায় চার ফুট অংশ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, যেখান দিয়ে প্রতিনিয়ত জোয়ার-ভাটার পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

‎ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে মামলার ১ নম্বর সাক্ষী মো. মিজানের মুখোমুখি হলে উন্মোচিত হয় নতুন হিসাব। মিজান জানিয়েছেন, ‘এই জমির প্রকৃত মালিক আবুল হোসেন মিয়া। আমি তার প্রতিনিধি হিসেবে এক বছর ধরে জমিটি দেখাশোনা করছি। বাদী ইব্রাহিম ৩৫ বছর ধরে জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদের যে দাবি এজাহারে করেছেন, তা সঠিক নয়।’

‎কথোপকথনের একপর্যায়ে পাশে বসে থাকা বাদী ইব্রাহিমের কাছে ছিনতাই হওয়া ৭০ হাজার টাকার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঘটে নাটকীয় ঘটনা। বাদী কিছু বলার আগেই তাকে ‘থাপ্পড়’ দেওয়ার হুমকি দিয়ে থামিয়ে দেন সাক্ষী মিজান। বাদীর জবাব কেড়ে নিয়ে তিনি বলেন, ‘ইব্রাহিম কী বলবে? যা জানার আমার কাছে শুনুন। ক্রিমিনাল মামলায় জমির মালিকের পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।’ নিজেকে সংবাদকর্মী দাবি করার চেষ্টাও করেন মিজান।

‎এজাহারে উল্লিখিত ৭০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের উৎসের ব্যাপারে বাদী ইব্রাহিম পরে দাবি করেন, তিনি চরফ্যাশন বাজারের সবজি আড়তদার কুদ্দুস মিয়ার কাছ থেকে সবজি বিক্রির অগ্রিম (দাদন) হিসেবে ওই টাকা পেয়েছিলেন।

‎তবে আড়তদার কুদ্দুস মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। কুদ্দুস মিয়া বলেন, ‘গত ৬ আগস্ট আমি ইব্রাহিম নামে কাউকে কোনো টাকা দিইনি। ওই নামে কাউকে আমি চিনিই না এবং উত্তর চর মানিকা এলাকায় আমার কোনো দাদনভুক্ত কৃষকও নেই।’

‎মামলায় অভিযুক্ত উত্তর চর মানিকা মৌজার বাসিন্দা কৃষক আকবর সরদার বলেন, ‘আমাদেরকে উচ্ছেদ ও হয়রানি করতে বানোয়াট গল্প সাজিয়ে মামলা করা হয়েছে। বংশপরম্পরায় আমরা এই জমি চাষাবাদ করে আসছি, যা মূলত উত্তর চর মানিকা মৌজারই অন্তর্ভুক্ত।’

‎প্রবহমান নদী দখল করে খামার দাবি করা এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে সাধারণ কৃষকদেরসহ ওই পরিবারের নারীদের আসামি করার এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক আলী হোসেন, কামাল ও গৃহবধূ ফাতেমা।

‎এদিকে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ আইচা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আহসান কবির বলেন, ‘মামলাটি রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই দিদারুল একজনকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। বর্তমানে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন।’

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।