ভোলার চরাঞ্চলে ২০০ বছরেও মহিষ পায়নি নিরাপদ আশ্রয়স্থল

মো: খাইরুল ইসলাম :
ভোলায় মহিষকে বলা হয় কালো সোনা। নদী ও সাগর বেষ্টিত দ্বীপজেলাটির মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা ছোটবড় অন্তত ৮৫ টি দুর্গম চরাঞ্চলে প্রায় ২০০ বছর ধরে মহিষ পালন করা হয়। এখানকার মহিষের দুধের কাঁচা টক দইয়ের রয়েছে জিআই পন্যের স্বীকৃতিও। কিন্তু জেলাটির সুনাম ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মহিষের জন্য চরাঞ্চলে আজও গড়ে ওঠেনি সরকারিভাবে নিরাপদ ও টেকসই আশ্রয়কেন্দ্র।
এতে উদ্বেগজনক হারে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাচ্ছে এবং প্রাণহানি হচ্ছে মহিষের,আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাতানিরা,মেলেনা সরকারি সহযোগিতাও।
একদিকে জলোচ্ছ্বাসে মহিষ ভেসে যাওয়া ও প্রাণহানির ঘটনাগুলোকে এ খাতের প্রতি সংশ্লিষ্টদের অবহেলাকেই দুষছেন বাতানি ও বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশন।
ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে,ভোলা সদর,দৌলতখান,বোরহানউদ্দিন,লালমোহন,তজুমদ্দিন,চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার ৮৫ টি চরাঞ্চলে ৩ হাজার ২৫০ জন বাতানি (খামারি) রয়েছেন। ছোটবড় ১৭৮ টি বাতানে ১ লাখ ২৪ হাজার মহিষ রয়েছে,এরমধ্যে বলদ মহিষ ৩২ হাজার এবং ৯২ হাজার রয়েছে গাভী মহিষ। প্রতিদিন গড়ে মহিষের দুধ উৎপাদন হয় ৮-১০ মেট্রিক টন। এছাড়া প্রতিটি মহিষের গড় বাজারমূল্য সোয়া এক লাখ টাকা করে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়,২০২৪ সালে মে মাসের ২৭ ২৮ ও ২৯ তারিখে ভোলা উপকূলে তান্ডব চালায় প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণিঝড় ‘রেমাল’। টানা ৩ দিনের জলোচ্ছ্বাসে ভোলার চরাঞ্চলের উন্মুক্ত বাতানে থাকা ৯ হাজার ৯৩১ মহিষ ভেসে গেছে,কয়েকদিন পরে অধিকাংশ মহিষের খোঁজ মিললেও এরমধ্যে মারা গেছে ২৬৯টি। সে বছর মহিষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি টাকায়।
এছাড়া ঘুর্ণিঝড় রেমালের জলোচ্ছ্বাসে বাতানে থাকা গরু ভেসে গেছে ৬ হাজার ৬৫৯ টি,অধিকাংশ গরু খোঁজখুজির পরে পাওয়া গেলেও মারা যায় ১৭৬ টি গরু। এবং ৭০ হাজার টাকা করে বাজারমূল্য হিসেবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দেড় কোটি টাকা। আর্থিক ক্ষতির সে ক্ষত আজও শুকায়নি বাতানিদের।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের আরও তথ্যমতে,সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই মাসে অতিজোয়ারে ভোলার ৭ উপজেলার চরাঞ্চল থেকে ৫৪৭ টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এরমধ্যে শুধু দৌলতখান উপজেলার নেয়ামতপুর চর থেকে জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ১৮ জন বাতানির ১০০ মহিষ,পরবর্তীতে প্রায় ৯৫ টির হদিস মিললেও মেলেনি ৫ টির খোঁজ, গো খাদ্যেরসহ মহিষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এতে গত দুবছরে বাড়েনি মহিষ ও বাতানের সংখ্যা।
ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ভোলার চরাঞ্চলে ২২টি মাটির কিল্লা থাকলেও নির্দিষ্টভাবে মহিষ ও গরুর জন্য নেই একটিও। তবে গবাদিপশুর জন্য বেসরকারি গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৩টি আত্যাধুনিক কিল্লা নির্মিতি হয়েছে। মহিষের নিরাপত্তায় প্রতিটি কিল্লায় ৫০০টি মহিষ ধারণক্ষমতার প্রায় ২৫০টি কিল্লা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ভোলা জেলা প্রাণি সম্পদ বিভাগ।
বংশ পরম্পরায় প্রায় ৬০ বছর ধরে ভোলার দৌলতখান উপজেলার নেয়ামতপুর চরে মহিষ পালনের সাথে জড়িত দৌলতখান পৌরসভা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো.জাকির হোসেন বাবুলের পরিবার। তিনি নিজেই মহিষ পালন করেন প্রায় ৩ যুগ ধরে।
চলতি বছরের ১৮ জুলাই তার বাতান থেকে ৭টি মহিষকে চরের উন্মুক্ত জমিতে ঘাঁস খাওয়ার সময় অতিজোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এক সপ্তাহের মাথায় ৩টি মহিষ নোয়াখালীর সুবর্ণচরে পাওয়া গেলেও এখনও হদিস মেলেনি ৪টি মহিষের।
জাকির হোসেন বাবুল বলেন,নেয়ামতপুর চরে আমার বাতানে প্রায় শতাধিক মহিষ আছে। সম্প্রতির অতিজোয়ারের নিখোঁজ আমার ৪টি মহিষের বাজারমূল্য ৮ লাখ টাকা,একদিনেই শেষ। এ ক্ষতি কবে নাগাদ পুষিয়ে নিতে পারব জানি না। মূলত চরে নিরাপদ আশ্রয়স্থল নেই মহিষের জন্য,সরকারি ভাবে কোনো উঁচু কিল্লা নির্মাণ করে দেয়নি,কিল্লা না থাকার ফলে পানির মধ্যেই আমরা মহিষ রাখতে হয়। শুধু নেয়ামতপুর চরেই বিভিন্ন বাতানিদের প্রায় ৩ হাজার মহিষ রয়েছে,আমরা বাতানিরা ব্যক্তি উদ্যোগে মাটি উঁচু করে নামেমাত্র কিল্লার ব্যবস্থা করেছি,এসব কিল্লা নিরাপদ না। জলোচ্ছ্বাস থেকে মহিষের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভোলার চরাঞ্চলে সরকারি টেকসই কিল্লা জরুরি প্রয়োজন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন,আমার মতো ক্ষতিগ্রস্ত বাতানিদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা তো দূরের কথা,ভোলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ বিভাগ আমাদের খোঁজও নেয়না।
প্রায় ৩ যুগ ধরে ভোলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে মহিষ পালন করেন সদর উপজেলার বৃহৎ মহিষ বাতানি আবু কাশেম। কাচিয়া,মধুপুর ও বৈরাগ্যার চরে তার ৩টি মহিষের বাতান রয়েছে। কিন্তু লাভের চেয়েও লোকসানের পাল্লা ই ভারি তার। বাতান থেকে গত ৩ যুগে তার প্রায় ৩০ টি মহিষ জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে,যেগুলোর আর হদিস পাননি তিনি।
আবুল কাশেম বলেন,মহিষের বাতান দেখাশোনার জন্য রাখাল রয়েছে। ঘুর্ণিঝড় রেমালসহ বিভিন্ন সময়ের জলোচ্ছ্বাসে আমার বাতান থেকে প্রায় ৩০ টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে,আর পাইনি সেগুলো। এতে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমি আমার মহিষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নতুন করে একটি কিল্লা নির্মাণের কাজ শুরু করেছি,এতে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে,এটা সম্পুর্ণ আমার মুলধন থেকে ব্যয় হবে।
আরেক বাতানি বেলায়েত হোসেন বলেন,গত ১৫ বছর ধরে মহিষ পালন করি। এ সময়ের মধ্যে জলোচ্ছ্বাসে ১২ টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে,আর পাইনি সেগুলো। সামান্য জোয়ার হলেই নিজস্ব উদ্যোগে নির্মিত কিল্লাও পানিতে ডুবে এবং ভেঙে যায়। মহিষের বাতান গড়ে লাভের মুখ দেখিনি।
সিরাজ মুন্সি বলেন,ঘুর্ণিঝড় রেমালে আমার ৩টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে পরে আর খুঁজে পাইনি। যখনই আবহাওয়ার পূর্বাভাসে উপকূলে কোনো সতর্ক সংকেতের খবর শুনি তখনই আমরা চিন্তায় পড়ে যাই চরে থাকা মহিষের জন্য। কারণ মহিষের জন্য যথাযথ নিরাপদ কিল্লা নেই। বড় কোনো জলোচ্ছ্বাস বা অতিজোয়ার হলে কোনো না কোনো ক্ষতি আমাদের হয়ই। পরিস্থিতি এমন হয় যে জোয়ারের চাপে মহিষ নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময়ও পাইনা। জলোচ্ছ্বাস থেকে মহিষের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বাতান আরও সম্প্রসারণ করবো।
শুধু জাকির হোসেন বাবুল,আবুল কাশেম ও বেলায়েত হোসেন ও সিরাজ মুন্সি নয়,ভোলার চরাঞ্চলে মহিষের জন্য নিরাপদ ও টেকসই কিল্লা না থাকায় জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ফারুক বেপারী,নাজিম হাওলাদার,খোকন ও নজির হাওলাদারসহ অসংখ্য মহিষ বাতানি।
মহিষ বাতানিদের সরকারি ভাবে বিমার আওতার আনার দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন,দু:খজনক হলেও সত্যি যে বাতানিরা জলোচ্ছ্বাস থেকে তাদের মহিষ রক্ষার জন্য নিজেরা যে নামেমাত্র কিল্লাগুলো তৈরি করেন তা ভেঙে যায় এবং মহিষ গরু ছাগল ভাসিয়ে নিয়ে যায় জলোচ্ছ্বাসে। এতে বাতানিরা প্রতিনিয়ত আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন,তাদের খোঁজ কেউ রাখে না। ভোলার চরাঞ্চলে টেকসই সরকারি কিল্লা প্রয়োজন। এ খাত আরও সম্প্রসারণ করা না গেলে ভবিষ্যতে মহিষের দুধের কাঁচা দইয়েই জিআই পণ্যের সুনাম ও ধরে রাখা দায় হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মহিষের উৎপাদন ও সংরক্ষণের উপর জোর দিয়ে ভোলা জেলা প্রাণিসম্পদ সম্পদ কর্মকর্তা মো.রফিকুল ইসলাম খাঁন বলেন,ভোলার চরাঞ্চলে মহিষের নিরাপদ আশ্রয়স্থলের জন্য অন্তত ২৫০টি টেকসই কিল্লা প্রয়োজন,পাশাপাশি মিঠাপানির উৎসেরও প্রয়োজন। মহিষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল না থাকায় ঘুর্ণিঝড় রেমালের জলোচ্ছ্বাসে ৯ হাজার ৯৩১টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে যায়,সর্বশেষ গত জুলাই মাসেই ৫৪৭টি মহিষ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যথাযথ কিল্লা না থাকার কারণে মহিষগুলো ভেসে যাচ্ছে। কিল্লা নির্মাণ করা গেলে জাতীয় সম্পদ মহিষের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যাবে এবং ভোলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মহিষের খাত আরও সম্প্রসাররিত হবে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মহিষ রক্ষা করতে না পারলে এর প্রভাব পড়বে জিআই পন্যের স্বীকৃতি পাওয়া দইয়ের ওপর বলে জানান তিনি।
মো.রফিকুল ইসলাম খাঁন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন,জনবল সংকটের কারণে বাতানিদের কাঙ্খিত সেবা দিতে না পারলে আমরা স্বল্প জনবল নিয়ে যথাযথ সেবা প্রদানে কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়া সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মহিষ বাতানিদের আর্থিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করা যাচ্ছে না।
এবিষয়ে জানতে চাইলে ভোলার জেলা প্রশাসক ডা.শামীম রহমান বলেন,ভোলার চরাঞ্চলে মহিষের নিরাপত্তার জন্য কিল্লা তৈরি অবকাঠামোগত বিষয়,রাষ্ট্রের পলিসি এবং প্রজেক্টের সাথে সম্পৃক্ত,বিষয়টি উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানাবো। দুর্গম চরাঞ্চলে এখনও যেখানে জমির মালিকানাই প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেখানে অবকাঠামো নির্মাণ সম্ভব হবে না। মহিষ জোয়ারের পানিতে ভেসে যাওয়ার ব্যাপারে মালিকদের সচেতন হতে হবে। মালিকদের উচিত জোয়ারের পানিতে মহিষ ভেসে যাওয়ার ব্যাপারে খেয়াল রাখা।
ভোলার চরাঞ্চলে লালন পালন করা মহিষের যথাযথ নিরাপত্তায় টেকসই কিল্লা নির্মাণের উদ্যোগ নিবে সরকার,এতে বাতান সম্প্রসারণের মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ হবে জেলাটির কৃষি অর্থনীতি,এমনটা প্রত্যাশা সকলের।
