তোফায়েল আহমেদের দাফন সম্পন্ন, জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল

শরীফ হোসাইন :
বাবা-মা’র কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় সায়িত হলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। মঙ্গলবার (২জুন) বিকাল ৪টা ১০ মিনিটের সময় তার গ্রামের বাড়ি ভোলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া এলাকায় তৃতীয় নামাজে জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশেই সমাহিত করা হয়।
এর আগে দুপুর আড়াইটায় ভোলা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইমামতি করেন ভোলার খলিফাপট্টি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. মহিউদ্দিন। জানাজায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম নবী আলমগীর, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রাইসুল আলমসহ দল মত নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং হাজারো মানুষের ঢল নামে। শেষবারের মতো তাকে এক নজর দেখা ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ভোলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও ভোলার সর্বস্তরের মানুষ।
জানাযা নামাজের পূর্বে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনারের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠককে। জেলা প্রশাসনের পক্ষে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামান ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ‘গার্ড অব অনার’ প্রদর্শন করেন।
ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর ও সদস্য সচিব রাইসুল আলম, জেলা বিএনপির সাবেক সম্পাদক হারুন অর রশিদ টুমেনসহ নেতারা জানাজাস্থলে এসে মরহুমের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। মঙ্গলবার দুপুর ২টায় জানাজার আগে তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহীন ও আওয়ামী লীগ নেতা হামিদুর রহমান বাহালুল, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইউনুছ, সাবেক পৌর প্যানেল মেয়র সালাউদ্দিন লিংকন বলেন, তোফায়েল আহমেদ একক রাজনীতি দলের নেতা নন। তিনি ভোলাবাসীর অভিভাবক ছিলেন। জানাজায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পাটি, জামায়াতে ইসলামসহ সব দলের সব পেশার মানুষ অংশ নেওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানান।
এর আাগে আজ মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে মরদেহ নিয়ে আসা হয় ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হেলিপ্যাডে। সেখান থেকে ফ্রিজিং ভ্যানে মরদেহটি নেওয়া হয় ভোলা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। এ সময় তোফায়েল আহমেদকে বহনকারী হেলিকপ্টার ঘিরে দলীয় নেতাকর্মী, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা হেলিপ্যাডে ভিড় জমান।
বর্ণাঢ্য জীবন :
বাংলাদেশের রাজনীতি ও আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্রনায়কের নাম তোফায়েল আহমেদ। দ্বীপজেলা ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামের ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মৌলভী আজহার আলী ব্যবসায়ী ও মা গৃহিণী ফাতেমা খানম।
১৯৬৪ সালে সদর উপজেলার ধনিয়ার বাসিন্দা মফিজুল হক তালুকদারের বড় মেয়ে আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে তার বিবাহিত জীবন শুরু হয়। তোফায়েল আহমেদ এক কন্যার জনক।
রাজনীতির বরপুত্রখ্যাত তোফায়েল আহমেদ ভোলা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি ও ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি উত্তীর্ণ হন।
কলেজজীবনেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের শুরু। ব্রজমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক পদে এবং কলেজের অশ্বিনী কুমার হলের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ইকবাল (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) হল ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, ১৯৬৫ সালে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ সালে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপির দায়িত্ব পালনকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন তোফায়েল আহমেদ। এরপর শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফাকে ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩৩ মাস কারাগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সব রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তির জন্য তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ সারা বাংলায় তৃণমূল পর্যন্ত গণ-আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দির মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে তিনি বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭০-এর ৭ জুন শেখ মুজিবের নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বস্তুত এরপর সংগ্রামী জননেতা তোফায়েল আহমেদ জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের একজন বলিষ্ঠ সংগঠকে পরিণত হন।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলতখাঁন-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছিলেন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার অধিনায়কের একজন। বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা এলাকার সমন্বয়ে গঠিত মুজিব বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার সংগ্রামে তোফায়েল আহমেদের অংশগ্রহণ ছিল।
১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাকে রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ দেন। ১৯৭৩ সালে নিজ জেলা ভোলা থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ঘোষণার পর প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী নিযুক্ত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ৬ সেপ্টেম্বর তোফায়েল আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারান্তরালে ছিলেন। ১৯৭৮ সালে কুষ্টিয়া কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনে ভোলার ৩টি আসনে প্রার্থী হলেও প্রতিটিতে পরাজিত হন তোফায়েল আহমেদ। এরপর ২০০৮ সালে ভোলা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে ভোলা-১ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও ভোলা-১ (সদর) আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। ২০২১ সালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তার রাজনীতির গতি স্তিমিত হয়ে আসে। এর পরেও শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে ২০২৪ সালে এমপি নির্বাচিত হন। জীবদ্দশায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে তিনি ৯টিতে বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
