হানিট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইল, ইউএনও’র নির্দেশে মনপুরা ছাড়ছেন অভিযুক্ত নারী

আবদুর রহমান সোয়েব, মনপুরা ॥
ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজীরহাট ইউনিয়নে কথিত ‘হানিট্র্যাপ, ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজি চক্রের’ অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১৫০ জন এলাকাবাসীর গণস্বাক্ষর সংবলিত লিখিত অভিযোগের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আবু মুছার নির্দেশে অভিযুক্ত নারী রুবিনা (ছদ্মনাম: পরিমণি) আগামী দুই দিনের মধ্যে মনপুরা ত্যাগ করতে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মনপুরা উপজেলার ২নং হাজীরহাট ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা রুবিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড, ব্ল্যাকমেইল, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অর্থ আদায় এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ করে আসছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন ব্যক্তিকে কৌশলে ফাঁদে ফেলে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারণ করে পরে সেগুলো ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ আদায়ের চেষ্টা করত।
অভিযোগে বলা হয়, গত ৭ মে হাজীরহাট বাজারের দধি ব্যবসায়ী রিটন চন্দ্র দাসকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে ৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি উদ্ধার হন। এ ঘটনার জেরে ৯ মে হাজীরহাট বাজারে ওই ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে মনপুরা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী রিটন চন্দ্র দাস তার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, পরিচয়ের সূত্র ধরে অভিযুক্ত নারী তার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান এবং একপর্যায়ে তাকে মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন এলাকায় দধি নিয়ে যেতে বলা হয়। পরে সেখানে গেলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে একটি ঘরের ভেতরে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, এ সময় তার মোবাইল ফোন ও পকেটে থাকা নগদ টাকা নিয়ে নেওয়া হয় এবং তাকে মুক্তি দিতে ৩ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে প্রাণ ভয়ে তিনি ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পান। খবর পেয়ে তার ছেলে ও স্থানীয় কয়েকজন গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন মাত্রা যোগ করেছে একটি সিসিটিভি ফুটেজ। স্থানীয়দের দাবি, যেদিন রাতে রিটন চন্দ্র দাসকে আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করা হয়, সেদিন রাতেই অভিযুক্ত নারী ও তার সহযোগী রহিমকে মনপুরার একটি দোকানে একসঙ্গে দেখা যায়। পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে স্থানীয়রা তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি, হুমকি ও সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়। এমনকি বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে তথ্য প্রকাশ করায় ভোলার বাণী ও দূরবীন নিউজের মনপুরা প্রতিনিধি আব্দুর রহমান সোয়েবকেও মামলা ও হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, তাকে না পেয়ে তার বড় ভাই সোহেল তাজের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, গত ১১ মে এলাকার ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমিক, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও নারীদেরসহ প্রায় ১৫০ জন এলাকাবাসী গণস্বাক্ষর করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেয়া হয়। অভিযোগে অভিযুক্ত নারীকে সামাজিকভাবে বয়কট ও এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন অভিযুক্ত নারীকে নোটিশ প্রদান করে। পরে রবিবার (১৮ মে) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আবু মুছার উপস্থিতিতে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ইউএনও অভিযুক্ত নারী রুবিনা ওরফে পরিমণিকে আগামী ২ দিনের মধ্যে মনপুরা ত্যাগ করার নির্দেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জানা গেছে, ওই নারীর শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লা হওয়ায় তাকে সেখানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে মনপুরায় এলেও দীর্ঘ সময় অবস্থান না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আবু মুছা জানান, অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী কোনো সংঘবদ্ধ চক্র বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ঘটনাটি নিয়ে পুরো এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলছে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
