ভোলায় ‘জ্বিনের বাদশা’ পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ, স্ত্রী-সন্তান ফেরত ও ন্যায়বিচার চাইলেন প্রবাসী
জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৩৭

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : অন্ধকার, সেই অন্ধকারেই যেন সে রেজাকে সে নিবিড় করে কাছে পেত। রেজার হাতটা সে নিজের হাতে নিয়ে খেলা করত। আস্তে আস্তে করে কাছে এগিয়ে আসত। নিজের মাখাটা বেজার বুকে রাখত। রেজা কোনদিন রেশমীকে গায়ে পড়ে আদর করত না। কিন্তু রেশমীর যেন গায়ে পড়া আদরটা ভাল লাগত। কত লোক আসত এই যমুনা নদীর পারে। স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনে মাতাল করা গন্ধে বিভোর হয়ে উঠত। শিহরে উঠত বুকের পাঁজরগুলি। রেশমী হারিয়ে যেত কল্পলোকের স্বপ্নপুরীর মাঝে। নদীর পারে বসে বসে কেউ ভাটিয়ালী গান গাইত। ওহ্। সে কি করুণ মিনতি। কেউ বাঁশি বাজাত। সে কি মধুর সুর। যেন মহুয়ার মাতাল করা আবেশ। সে আবেশে রেশমী যেন ঘুমিয়ে পড়ত। রেজা বলত, অনেক রাত হল, রেশমী ঘরে যেত। আস্তে আস্তে রেশমীর শরীর ভারী হয়ে এল। এখন সে আর নদীর পারে যায় না। বাড়ীতেই থাকে, রান্না করে, রেজাকে নিজের হাতে আদর করে খাওয়ায়, সেলাই করে।
রোযার সময় এসে গেল, ভীষন শীত, রেজা রোযা রাখে, নামায পড়ে। রেশমী ইফতারের সময় রেজার জন্য বড় ব্যস্ত। পরে একদিন রাতে রেশমী খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল- শেষ রাতের দিকে একটা ছেলে হল। ছেলেটা দেখতে খুব সুন্দর। মাথা ভরা কালো কোকড়ানো চুল। ছেলে ভূমিষ্ট হওয়ার সময় রেশমীর তেমন কষ্ট হয় নি। মা এসেছিল, সে কাছে ছিল। লেডি ডাক্তার না আসতেই বাচ্চা হয়ে গেল। মা রেশমীকে খুলনায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল, সেখানে বাবা আছেন, রেশমী নিজেই গেল না। কেন যেন রেজার জন্য তার মনটা কেঁদে উঠল। রেশমী মাকে বলল, মা তুমি থাক। রেজা কিন্তু রেশমীকে খুলনায় যাওয়ার জন্য অনুমতি দিয়েছিল। রেশমী তার ছেলের নাম রাখল মিঠু। মিঠুর বড় বড় দু’টো চোখ, মোটা সোটা যেন কোল ভরা ছেলে। রেশমী যেন মনে মনে বড় আনন্দ পেল। মনের গহনে যে কালিমা ছিল, এতদিন পর কে যেন এসে ধুয়ে মুছে দিয়ে গেল।
হাসিতে আনন্দে তার সংসার ভরে উঠল। আবার রেশমীর মনে পান এল। ছেলেকে কোলে করে ঘুম পাড়াত আর গান গাইত। আমারে ভালবেসে, আমাতি লাগিয়া, সয়েছ কত ব্যথা, বেদনা, অপমান- আমারে ভালবেসে। রেজাও যেন কেমন বদলে গেল- ছেলেকে সেও সেন ভালবাসে। অফিস থেকে এসে মিঠুর পানে চায়। মিঠু ঘুমায়, ওর গায়ের রংটার সাথে লাল মশারির রংয়ের সাথে মিলে যায়। দিন চলে যায়, মিঠু একটু একটু হাটতে বিয়ে। এ পাশ ওপাশ হতে শিখে। মিঠু কিন্তু রেশমীর মত হয় নি, ও হয়েছে ওর বাবার মত। মিঠুর বয়স ২৫ দিন হওয়ার পর রেশমীর মা খুলনায় চলে গেল। মিঠুকে নিয়ে রেশমী বড় বিব্রত হয়ে পড়ল। ভাল করে খাওয়াতে জানে না। গোসল করাতেও বড় অসুবিধা বোধ করে। তবুও রেশমীর হাতে খড়ি হতে থাকে। মিঠু মাঝে মাঝে বড় কাঁদে। বাসার পাশে এক ভদ্র মহিলা এসে বললেন- পেট কামড়াচ্ছে, পেট সেকতে হবে। আস্তে আস্তে করে মিঠুর স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে থাকে।
তখন শীতের ওড়না পড়া, কুয়াশা ঢাকা হেমন্তের ঘুম জড়ান চোখে শীত এসে গেল। বিকালে, সকালে সোয়েটার পরে মনে হত ভিনদেশী মানুষের সন্তান। বাসায় একজন বাবুর্চিও একজন আয়া নিয়েই তাদের সংসার। রেজার একটা মামাত ভাই ও তাদের কাছে থেকে স্কুলে পড়ে। তাকে পাড়াবার জন্য একটা কলেজের ছেলে জায়গীর থাকত। রেজা যা বেতন পেত তার অর্ধেকটাই বাড়ীতে চাচার জন্য পাঠাত। মাসের শেষে সংসারে হাত খরচের টাকার সমস্যা হত। শেষ পর্যন্ত বাজারের দোকানদারদের কাছ থেকে ধার নেওয়া লাগত। রেজার এক দূর সম্পর্কের চাচাকে মাসে ৫০ টাকা করে খরচ দিতে হত।
এমনি করে টেনে টুনে সংসারটা চলছিল। রেজার কাছে রেশমী প্রায় এক বছর হয় এসেছে। আজ পর্যন্ত রেজা একখানা ভাল কাপড়, এমনকি একখানা গয়নাও গড়িয়ে দেয় নি। বাবার কাছ থেকে রেশমী যা পেয়েছে তা-ই তার সম্বল। মিঠুর বয়স যখন এক বছর হলো, তখন রেশমী মিঠু ও রেজাকে নিয়ে দেশে গেল। রেশমীর বাবা ও মা রেশমীকে পেয়ে যেন হাতে স্বর্গ পেল। সবচেয়ে খুশী হল বাবা মিঠুকে দেখে রেশমী বাড়ী যাওয়ার পথে একখানা বিছানা ঝাড়া ঝারু নিয়ে গেল। মা তা দেখে অনেক খুশী হলেন। রেশমী যেন মনটা চেতনা না পেয়ে লজ্জায় মুছড়ে পড়ল। ভাবল বাবা, মা, ভাই বাশী ওদের জন্য কিছু আনা উচিত ছিল। রেশমী কি করবে, রেজা কিছুই বলল না। তাছাড়া রেশমী বাজার খরচের টাকা থেকে দীর্ঘ দিন যাবত ২৫ টাকা বাঁচিয়ে রেখেছিল। তাও রেজার হাতে তুলে দিয়েছে।
(চলবে——-)
