জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-২৪

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : জীবন মৃত্যু : জীবন ও মৃত্যু গভীর ভাবে জড়িত। কেননা যে মুহূর্তে আমরা জন্ম নেই। সে মুহূর্তে মৃত্যুর ঘণ্টা ধ্বনি বেজে ওঠে। তাই কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, চিন্তাশীল ও দার্শনিক যারা জীবনকে গভীর ভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। তারা জীবদের মধ্যেই মৃত্যুর ছায়াপথ গভীর ভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন। জীবন এত সুন্দর, অথচ মৃত্যু এমন নিষ্ঠুর জীবনের সকল ক্ষুধা সৌন্দর্য-মাধুর্য, রূপ-রশ গয়, গান সকল কিছু মৃত্যু হঠাৎ এক নিমিষে হরণ করে নিয়ে যায়। তারপর কি ভীষণ স্তব্ধতা, নিদারুণ শূণ্যতা ভয়াবহ অন্ধকার। জীবনের সাথে মৃত্যুর এই বিপরীত বা বৈরী আচরণ মানুষকে হতাশায় নিমজ্জিত করে। মানুষ নিজেকে পরপারের জন্য গঠন করতে পারে। যুদ্ধ ও শান্তি উপন্যাসে তিনি মৃত্যুকে দেখছেন একটা অদ্ভুত জন্ত হিসেবে।
উপন্যাসের অন্যতম নায়ক চরিত্র এন্ড্রর মাধ্যমে তার সেই অনুভূতি বিধৃত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত এন্ড্র মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পেয়েছে এবং তার সাক্ষাৎ লাভ করেছি। মৃত্যু যেন সেই আদি জন্তুর মতো একটা প্রাণী সে ঘরে এসে ঢুকলো। এন্ড্রু ওকে চেনে ওতো মৃত্যু তার কাছে এগিয়ে আসছে এ স্থান থেকে তাকে পালাতে হবে নইলে মৃত্যু। বার বার শত চেষ্টা করে মৃত্যুকে পরাস্ত করতে পারবে না এন্ডু। এ বারে এভুর মৃত্যু হলো। উপন্যাসের অন্য চরিত্র, শিল্পি তলস্তরের শেষ জীবনে রূপান্তর ঘটে ঘুষি তলস্তয়ে। এ নাম পরিবর্তন করেও তিনি মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায় নি। মৃত্যুর ভয়ে ভীত হয়েছে। তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে বাড়ী ছেড়ে গভীর রাতে পালিয়ে গেলেন অজানার উদ্দেখ্যে। যেমনি মৃত্যুর সংবাদ শুনে জন্তু পালিয়ে যায় নির্জনতায়। আর মৃত্যুর বাতিই প্রদীপ তাকে মুক্তি বা পরিত্রানের প্রয়সী করে তুলেছে।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে মোকাবিলা করেছেন স্থির অবিচল থেকে যা বাস্তবতা মিলে ১৪০০ সাল কবিতার ভাবধারায়। অসুস্থ বালিকা কন্যা রাণীকে বাঁচাবার জন্য কত না সাধ সাধনা করেছেন। তার পরও শেষ মুহূর্তে তাকে মৃত্যুর দ্বারে পৌঁছে দিয়েছেন। পিতা নোহাসি এই মন্ত্র দিয়ে দশ বছরের বালক পুত্রের শরীর আকস্মিক মুত্যুকে তিনি গ্রহন করেছেন অবিচল চিত্রে। দীর্ঘ রোগাক্রান্ত থাকার পর অকালে স্ত্রীর মৃত্যুও তাকে ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারেনি। আর নিজের জীবনে কঠোর ঝুঁকি ও যাতনার মধ্যে ও নিপুণ মৃত্যুর ফাদে পা দিতে তিনি বিচলিত হননি।
প্রতিভায় তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথের প্রায়ই সমতুল্য জীবন বোধের গভীরতায় বলিষ্ঠতায়, ব্যাপকতায়, দৃষ্টির স্বচ্ছতায় দুঃজনের মধ্যে সাধর্ম ও সাদৃশ্য আছে। কিন্তু তলস্তয়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মৌন ব্যবধান এ জায়গায় যে, তলস্তয়ের মত রবীন্দ্রনাথ জীবন থেকে পালিয়ে যায়নি। বরং জীবনের প্রতি এমন গভীর ভাল বাসায় উদ্বেলিত হয়েছেন। জীবনের প্রতি এমন নিবির ভালবাসা, গভীর মমত্ববোধ এর তুলনা বড় একটা মিলেনা। জীবনকে তিনি অন্তরাঙ্গ রূপে ভাল বেসেছেন। তাই মৃত্যু চিন্তা তাকে বিচলিত করেছে। কিন্তু মৃত্যুকে তিনি তলস্তয়ের মত কদামার জীব হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি মৃত্যুকে সাদর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
(চলবে—–)
