জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-২২

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : মিস্টার খান মেয়ের পারিবারিক এসব হাঙ্গামার কথা হয়ত জানতেন না বা মিসেস খানই তাকে অবগত করান নি। মেয়ে জামাইর এত মান অভিমান। মেয়ের প্রতি জামাইর এত অত্যাচার, অবিচার, নৃশংসতা কোনদিন অবগত করান নি। খুব শান্তশিষ্ট, ভদ্র পরিবার বলে তাদের একটা খ্যাতি ছিল, খ্যাতিটুকু স্নান যেন না হয় সেজন্য হয়ত বা কুসুমও শত দুর্ব্যবহার স্বামীর অশালীন আচরণ সব সময়ই মার কাছে চেপে যেতেন। কুসুমকে ঈদে বা বিশেষ আয়োজনে স্বামী তাকে একখানা নতুন ভাল শাড়ীও কিনে দেয়নি। তবু মুখ তুলে নিজের চাহিদার কথা বলে নি। নিজের স্বামীর গৌরব বজায় রাখতে গিয়ে মা-বাবার কাছে কিছু চেয়ে তাকে ছোট করে নি। আজ মিসেস খান সাহেবা মেয়ের কথা বলে কাঁদেন আর দুঃখ প্রকাশ করেন। তার হৃদয় পিঞ্জরে অনেক স্মৃতি গুমড়ে গুমড়ে উঠে অস্থির করে তোলে।
কুসুম দু’টো ছেলেমেয়ে রেখে গেছে। একটি মেয়ে একটি ছেলে। তা-ও মিসেস খানের কাছে আসতে দেয় না। কুসুম আস্তে আস্তে কেমন নির্জীব হয়ে যাচ্ছিল, মার চোখে ধরা পড়ে। মা বলেন, কিরে কুসুম তুই শুকিয়ে যাচ্ছিস কেন? কুসুম বলে, মা ছেলেটা ও মেয়েটার যন্ত্রণায় একদম বিশ্রাম নিতে পারি না। নিয়ম মত খাওয়া-দাওয়া হয় না। ঘুম আমার জীবন থেকে হারাম হয়ে গেছে। মা বললেন, ক’দিন আমার কাছে থেকে একটু বিশ্রাম নে না? মেয়ে চুপ করে থাকে। মি. খান মেয়েকে বলেন, পিজিতে একটা গাইনী কোর্স চলবে, তুমি কোর্সটা কমপ্লিট করে নেও। কুসুম এ ব্যাপারে সম্মতি জ্ঞাপন করল।
মিসেস খান বেয়ানকে বলে মত করিয়ে নিলেন। জামাই তখন সৌদী আরব ইরানে চাকরীরত ছিল। আসতে হয়ত দু-চার মাস দেরি হবে। মেয়ে পি.জি.তে ট্রেনিংরত আছে। এর মধ্যে জামাই আসার সময় এগিয়ে এল। মেয়ে চিঠি পেল মাসের ১৮ তারিখে দেশে আসছে। চিঠি অনুযায়ী মিসেস খান মেয়ে নিয়ে রাত বারটা থেকে ভোর পাচটা পর্যন্ত জিয়া আন্তরজাতিক বিমান বন্ধরে জামাইর অপেক্ষায় সময় অতিবাহিত করে। কোথায় জামাই, জামাইকে না পেয়ে মিসেস খান ও কুসুম ফিরে এলো। তার পরদিন জামাই ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরন করে তার বাসায় এসে হাজির হয়।
কুসুম তখন পি.জিতে ট্রেনিং করার জন্য গিয়েছে। জামাই মুখ ভার করে বাচ্চাদের নিয়ে চলে গেল। কুসুম পি.জি থেকে এসে জানতে পেরে তাৎক্ষণিক শ্বশুর বাড়ী চলে গেল। পি.জিতে কোর্স করার অপরাধে যা কিছু ঘটেছে কুসুম কোন সময় মুখ খুলে বলে নি। আমরা দূর থেকে অনেকটা অনুমান করা সত্ত্বেও বলতে পারি নি। এরপর ইরান যাবার একটি বিজ্ঞাপন দেখে কুসুম দরখাস্ত করল। ইন্টারভিউ হয়েছে। বেশী ভাল ইন্টারভিউ হয় নি বলে কোন আশা সাহস করেনি। অন্য কাউকে বলে নি। হঠাৎ ইরান থেকে এপয়েন্টমেন্ট পেয়ে কুসুমের বুক আনন্দে ভরে গেল। মাকে এসে বলল, আমি ইরানে চাকরী পেয়েছি, যেতে হবে। ইন্টারভিউ ভাল হয় নি বলে তোমাদের জানাই নি। এখন বলছি যেতে টাকা লাগবে। আমাকে পনেরো হাজার টাকা দেবে? মিসেস খান বললেন, দেব।
কুসুম ইরান যাবার জন্য মেডিকেল চেকআপ করতে গেল। শরীর ক্লান্তিতে, শ্রান্তিতে, অবসন্নে এলিয়ে পড়তে চায়। দিন দিন তার শরীর ক্ষীণ হতে থাকে। চেকআপ করতে ধরা পড়ল, কুসুমের লান্স-এ পানি জমে আছে। বাবা বড় ডাক্তার, বাবার কাছে এসে জানাল। বাবা সি.এম.এস.এ ভর্তি করে দিলেন। অনেক কষ্টে সিট পেলেন। ডাক্তাররা পানি বের করে ভিতরে ঔষধ ঢুকিয়ে দিল। পানি আর কমে না, শ্বাস কষ্ট হচ্ছে। কুসুম বাবার সাথে আলাপ করে ইরান মেডিকেল কলেজে কিছুদিনের ছুটি চেয়ে নিল।
ডাক্তাররা প্রমাদ গুণল। মি. খান একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার। সি.এম.এস.এ বিদেশী ডাক্তার সহ বোর্ড বসল। সিদ্ধান্ত হলো কুসুমের পেট অপারেশন করার জন্য। একদিন পর অপারেশন হলো, মিসেস খান চিৎকার করে কেঁদে মি. খানকে জানান মেয়েকে বুঝি আর বাঁচাতে পারব না। মি. খান একজন ডাক্তার। সে দেখল তার মেয়ের ওভারিতে টিউমার তার থেকে স্টমাক পর্যন্ত ক্যান্সারে ছেয়ে গেছে। তারা দু’জনই অসম্ভব ভেঙ্গে পড়লেন। মেয়েকে সি.এম.এস.এ ক’দিন অক্সিজেনের মাধ্যমে রাখলেন।
মি. খান ও মিসেস খান সিদ্ধান্ত নেন, তারা মেয়েকে ব্যাংককে নিয়ে যাবেন। তবু দু’চার দিন একটু ঘা শুকানোর জন্য অপেক্ষা করলেন। বাসায় খতমে ইউনুছ সহ বিভিন্ন দোয়া মুনাজাত করালেন। অনেক বন্ধু-বান্ধব, ধানম-ির পাড়া-প্রতিবেশী, অগণিত শুভাকাঙ্খী তাঁর বিপদে এসে সহমর্মিতা জানাল। কুসুম শেষবেলায় সেই বাসর রাত থেকে তার স্বামীর সাথে তার হৃদয় বিদারক যা যা ঘটেছিল তা খালা, ফুফু সকলের কাছে বর্ণনা করে গেছেন। কুসুমের শরীর খারাপ হলে বাবার কাছে যেতে চাইত। জামাই বলত, তোমার বাবা কি এমন ডাক্তার? যে তোমার সেখানে যেতেই হবে? অন্য ডাক্তার দেখাও।
বাচ্চাদের অসুখ হলে কুসুম বাবার কাছে দেখাতে চাইত। জামাই বলত, তোমার বাবা কি চাইল্ড স্পেশালিস্ট যে শিশুদের রোগ নির্ণয় করবে? তোমার বাবা আমার মর্যাদা দেয় না। আমার ছেলেমেয়ের মর্যাদা দিবে? তোমার মর্যাদা দিবে? তোমাকে তারা অবহেলা করে, তুচ্ছ বোধ করে। আমিও বড় চাকুরী করি না বলে আমার কোন দাম তোমাদের বাড়ী নেই। আজ কুসুম মরণ শয্যায় শুয়ে চোখ বুজে বুঝতে পারছে কে তাকে অবহেলা করে। তার স্বামীকে ভাল করে বুঝতে পারছে। তাকে খবর দিয়ে কাছে আনা যায় না। যদিও কভু আসে, কি যেন বলে, তখন কুসুমের চোখ জড়িয়ে পানি পড়তে থাকে। বাবা, মা দু-জনই কুসুমের গোলাপের মত পাপড়ি ছড়ানো মুখখানার দিকে চেয়ে অঝোর ধারায় কাঁদে।
কুসুম মা’র কাছে, ফুফুর কাছে স্বামীর অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছে। তাকে মারধর করেছে। তিলে তিলে নরকের মত যন্ত্রণা দিয়ে নিষ্পেষিত করেছে। শোষনে অত্যাচারে তাকে বাঁচার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। বাঁচার যে একটা স্বাধ আছে তা তার স্বামী তার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। অহরহ তাকে কথায় কাজে পীড়ন করেছে। কুসুমকে নিয়ে মি: খান ও মিসেস খান ব্যাংককের পথে পাড়ি দিল। সেখানে দু’সপ্তাহ ডাক্তারদের যা যা করার সব চেষ্টা শেষ করল। মি. খান জানতো মেয়ে বাঁচবে না। তবুও বাবা-মার অন্তর মানে না, স্বীকার করে না মৃত্যুকে, অপরাজেয় সে মৃত্যু।
(চলবে——–)
