সংসারের বিড়ম্ভনা

এম. আর. আমিন,
জীবনে যুদ্ধ করতে করতে যখন ক্লান্ত। এর মধ্যে কখন ভালোবাসা এলো আর নীরব অভিমানে বিদায় নিলো তা মোটেই টের পাওয়া যায়নি। জীবনে এটা এখন নিহত গোলাফ। কখন যে হাহাকার করে আর্তনাদ করে জীবন থেকে হারিয়ে গেল অনেক দূরে। কত মানুষ ভালবাসার জন্য নিজের জীবনকে ধ্বংস করে দেয়। আবার কেউবা ভালবাসাকে ছেলেখেলা মনে করে দু পায়ে ঠেলে দিয়ে নিজের মনের মতো জীবনকে বেছে নেয়। মাঝে মাঝে ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্খা জাগলেও তা নিমিষেই শেষ হয়ে যায়। বিখুদ্ধ জীবনে কি আর ভালবাসা আসতে পারে? নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ থেকে কক্ষচ্যুত হয়ে পড়ে যায়। পথহারা পথিকের ন্যায় নিরুদ্দেশ যাত্রা শুরু হয়। দুর্ভাগা জীবন নিয়ে পৃথিবীর আঁকাবাকাঁ পথে পথ চলা শুরু হয়। বিত্তহীন, অর্থহীন ব্যর্থ জীবনে যদি কখনো ঝড় আসে সেই ঝড়ে, জীবনের সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়। জীবন হয়ে পড়ে লক্ষ্যহীন। অজানা গন্তব্যে পথচলা শুরু হয়। অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা নিয়ে শুরু হয় জীবন। জীবন চলার পথে শুরুতে হোচট খায়। শুরু হয় অন্য আর এক জীবন তবে যে লক্ষ্য নিয়ে জীবন শূরু সেই লক্ষ্যে পৌছাতে সক্ষম হওয়া যায় না। জীবনে কেউ যদি কোন কিশোরীকে বিয়ে করেন ঐ কিশোরীর সংসার ধর্ম তার কাছে নতুন এক অধ্যায়। কৈশোর জীবন কি আর পরিপক্ক সংসারী জীবন উপহার দিতে পারে। অভাব অনটন আর অর্থহীন বিত্তহীন জীবনের সংঙ্গে খাপ খাওয়াতে এ কিশোরীর অনেক সময় লেগে যায়। মাঝে মাঝে হয়তো চিন্তা আসে এ কৈশোরীর অভিভাবকরা ভূল করে এ কাজটি করেছে। তারা মোটেই বুঝতেই পারেনি এ কি কঠিন জীবন দুঃখময় জীবনে পরিনত হবে। হলোনা সুখ পাখিটার পাওয়ার আশা। কখনো কখনো সংসার জীবনে অশান্তি এলেও তা আবার কাটানোর প্রচেষ্টা করা হতো। সে কেনো খামাখা অশান্তি পোহাবে। ঐ কিশোরী যদি নতুন কোন সিদ্ধান্ত নিতেও পারে। বিষিয়ে যাওয়া জীবন কোন না কোন ভাবে চলতে থাকে। পথ যে কত কাটা বিছানো তা সে টের পাচ্ছিল। এ পথে কত কাটা বিছানো সেই তো সে জানে। যাক কষ্টটা একাই করে যাচ্ছে। তারপরও এ কষ্টের ঝাঝ ঐ কৈশোরীর গায়ে ও মনেও লেগেছে। হয়তো এ কারাগার থেকে বেরুবার চেষ্টা করে সফল হতে পারেন। তবুও মেনে নিয়েছে দূর্ভাগা জীবন। বহুবার চেষ্টা করেছে লক্ষ্যে পৌছাবার কিন্তু সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। ঐ কৈশোরী শুধু এখানেই ধাক্কা খায়নি তার অভিভাবকরা তাকে মানবিক আর এক ধাক্কা দিয়েছে। কিশোরী এখনো সবেমাত্র যুবতীর পর্যায়ে হতে চলেছে। ঐ মুহূর্তে সে হয়েছে অন্য একজনের প্রেমিকা। আর তখনি তার অভিভাবকরা তাকে অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে হৃদয়ে কষাঘাত করলো। সে মানলো কি মানলো না এটা দেখার কেউ নেই। কেন এমন হলো? সংসার জীবন চলতে লাগলো। তার পরিবার থেকেও যন্ত্রনার অনল চলতে লাগলো।
কিশোরীর স্বামী দু-কুল পেতে গিয়ে দু কুলই হারিয়েছে। কোন কুলেই ঠাঁই হলোনা তার। আপ্রান চেষ্ঠা করেও অর্থ, মেধা, শ্রম দিয়ে দুকুলকেই কাছে পাওয়ার সকল আয়োজন ধুলিস্মাৎ হলো। সাধ্যমতো যাকে যা দেবার তা দিয়েছে তবুও সবাই খুশি হয়নি। ফল হলো উল্টো। বুঝতে বাকী রইলোনা তাদের জন্য কিছুই করা হয়নি। এ যন্ত্রনা নিয়ে জীবন চলা থমকে দাঁড়াতে চাইলো। মনে হলো এতদিন অমানুষের বোঝা বয়ে বেরিয়েছে। এখন নিজের বোঝাটা নিজেই বয়ে চলার পালা। অতীত নিয়ে এখন আর দুঃখ করেনা সে। কপালে যা ছিল তাই হয়েছে। তবে সব কুল থেকে এভাবে লাঞ্চনা পেতে হবে তা মনে করেনি। তবে মনে যে এ নিয়ে কোন ভাবনা ছিলনা তা কিন্তু নয়। শেষ পর্যন্ত জীবনের জটিল অংকটা আরো জটিল হলো। এ আর হয়তো জীবনের শেষ বেলা পর্যন্ত শেষ হবেনা। সবাই ভাবে ভালো করে লেখাপড়া করলে সুখী হওয়া যায় এবং ভালো করে লেখাপড়া করলে ভালো পাশও করা যায়। কিন্তু ভালো পাশ করলে সুখ মিলবে তা আশা করা কঠিন। শুরু হলো চাকুরী খোঁজা, একটার পর একটা ইন্টারভিও অনেক খোঁজার পর চাকুরী হলো। এবার মনে হয় সুখী হওয়া যাবে। শুরু হলো সংসারের সকলের চাহিদা পূরনের পালা। ঈদ এলে সকলের জন্য কেনাকাটা করলেও নিজের জন্য কিছু কেনা হতোনা। এজন্য কেউ কিছু জিজ্ঞাসাও করতোনা। মনে হলো বিয়ে করলে হয়তো সুখী হওয়া যাবে। তাই বাবা মায়ের চাহিদা মত বিয়ে হলো কিন্তু বিয়ে করেও সুখের সন্ধান পাওয়া গেলনা। একদিকে বাবা মায়ের আদেশ, নিষেধ ভাইবোনদের আবদার, বউ এর অভিমানী দৃষ্টি সব মিলিয়ে সুখ যেন সোনার হরিনে পরিনত হলো। এরপর বাকী আছে অফিসের নানা কাজের পেরেসানি। জীবনে সুখ খুঁজতে গিয়ে জীবনটা হতাশার অগ্নি কুন্ডলীতে পরিনত হলো। বাবা মাকে খুশী করতে গিয়ে সারাজীবন সবার দিকে নজর রাখতে হলো আবার শ^শুর বাড়ীর লোকদের খুশি করতে গিয়ে যা যা করতে হয় করা হলো।
আসলে কোন পক্ষেরই খুশী করা হলোনা। মনে হয় জীবনটা দিয়ে দিলেও বেশী কিছু দেওয়া হতোনা। তাই আঁধারের যাত্রী হয়ে এখন অন্ধকার পথে চলা। আঁধারের নীরবতা নিশীতের কালো রাত, অমাবস্যার নিকষ অন্ধকার যে জীবনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। তা কি আর আলোর দেখা কখনো পাবে। কোন দিন আর যে অতীত জীবনকেতো ফিরে পাওয়া যাবেনা তবে জীবন যদি প্রথম থেকে শুরু করা যেত কিন্তু নিয়তি কি আর শত চেষ্ঠার পরেও সে সুযোগ দিবে। অতীতের কষ্টের কথা মনে পড়লে এক বিভীষিকাময় জীবনের কথা স্মৃতিতে ভেসে উঠে। এক সময় সবাই ভাবে পৃথিবী একটি সুন্দর জগত। নিজের মতো করে অনেক মমতা দিয়ে এই পৃথিবী সাজাবে। পৃথিবীতে এসে দেখে কারো ঠিকানা কারো খাদ্য কারো বস্ত্র নেই। অসহায় অবস্থায় কিছু মানুষ। যদি তাদেরকে নিজের পৃথিবীতে ঠাঁই দেন একদিন হয়তো দেখবেন আপনার পৃথিবীতে আপনি নেই। আপনাকে ব্যবহার করে তারা এখন পৃথিবী নামক রাজ্য দখলে নিয়েছে। আর আপনাকেই ভূলে গেছে। তারা এখন আপনাকে ছোট করে নিজেদের বড়ত্ব জাহির করে। সফলতার ফানুস উড়িয়ে আতশবাজির উৎসব করে আর আপনাকে ব্যর্থ মানুষের দলে ভিড়িয়ে আত্ম তৃপ্তিতে ভোগে। খুব অকৃতজ্ঞ এই পৃথিবীর অদ্ভুত মানুষগুলো রংরুপ বদলাতে সময় লাগেনা। যাদের সেদিন পথ চিনিয়েছিলেন তাদের কাছে এখন আপনি অচেনা হয়ে গেলেন তারাই এখন আপনাকে আপনার পৃথিবীর থেকে বের করে দিয়ে পথের মানুষ বানিয়েছে।
