রক্তঝরা দিনগুলি : পর্ব-০৫

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : মানিক মিয়া এভিনিউতে ভিড় থাকা সত্ত্বেও লোকজন আমাদের সম্মানে পথ ছেড়ে দিল। বঙ্গবন্ধুর বাড়ী পৌছে ছোট্ট লনটাতে আমরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু পরেই বঙ্গবন্ধু এলেন, আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ভালোবাসার বঙ্গবন্ধু। আমি মেয়েদের কমান্ড করে বঙ্গবন্ধুকে গার্ড অব অনার দিলাম এবং হ্যান্ডসেকের জন্য হাত বাড়ালাম। তিনি হ্যান্ডসেকের পরিবর্তে আমাদের সালাম জানালেন। আমি মুগ্ধ হলাম। সেদিন কোন স্যালুটিং ব্যাজ ছিল না, ফুলের টব ছিল না, ন্যাশনাল ফ্লাগ ছিল না, কোন ব্যান্ড বিউগলের সুর বাজছিল না। শুধু বঙ্গবন্ধু, আমি আর আমার দল। এই প্রথম বুঝি আমি কোন খাঁটি বাঙালিকে স্যালুট করেছিলাম। এদিনটি আমার জীবনের স্মৃতিপটে আঁকা থাকবে। এই গার্ড অব অনারের দৃশ্যগুলো সেদিন টিভিতে দেখানো হয়েছিল।
অসহযোগ আন্দোলন তখন চরম পর্যায়ে। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। আশা-নিরাশার দোলাচলে মানুষ উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাকবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। ঢাকা রাজপথে নেমে পড়ে শত শত ট্যাংক। ট্যাংক আর মেশিনগানের অবিশ্রান্ত গোলায় সুত্রপাত ঘটে নরমেধযজ্ঞের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় শত শত ছাত্র-ছাত্রীকে। হত্যা করা হয় আগে শিক্ষাকে। হামলা চালানো হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। বাঙালী পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধ রচনার চেষ্টা করে। শাহাদাত করণ করেন অনেকে। ঢাকার রাজপথে অলিগলিতে পাকবাহিনীর নির্বিচার গোলাবর্ষণে ওই রাতেই নিহত হয় বহু নারী-পুরুষ-শিশু ও বৃদ্ধ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাজধানী পরিণত হয় এক বিধ্বস্ত বিরান নগরীতে। ঘর বাড়ী থেকে নিরীহ লোকদের ধরে নিয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাতে আরম্ভ করে। পরে তাদের হত্যা করা হতে থাকে নিষ্ঠুরভাবে। পাকবাহিনীর এই হত্যা, অকথ্য নির্যাতন, লুটপাট আর অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সারা বিশ্বের মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়। সারাদেশ যেন একটা নিথর কবরখানায় পরিণত হয়। প্রায় এক কোটি মানুষ সীমান্ত পার হয়ে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচায়।
পাকবাহিনী ২৫ মার্চের এই ধংসযঙ্গ চালানোর সাথে সাথে বঙ্গবন্ধুকেও গ্রেফতার করে সেনানিবাসে নিয়ে যায়। গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা সম্বলিত টেলেক্স বার্তা রেখে যান। চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা এম. এ. হান্নান এই টেলেক্স বার্তাটি ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচার করে দেন। কিন্তু ট্রান্সমিটার স্বল্প শক্তি সম্পন্ন হওয়ার কারণে দেশজুড়ে সেটা শোনা যায়নি। পরে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুর ঘাট ট্রান্সমিটার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণাটি পড়ে শোনান। এটি দেশজুড়ে শোনা যায়। ফলে হতবিহ্বল বাঙালি জাতি নতুন করে উদ্দীপিত হয়ে ওঠে। তাই দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে উঠতে থাকে সারাদেশে। বাঙালির মনোভাব চাঙা রাখার জন্য ওই বেতার কেন্দ্র থেকে বলা হয় যে, বঙ্গবন্ধু মুক্ত আছেন এবং নেপথ্যে থেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।
(চলবে————)
