সর্বশেষঃ

রক্তঝরা দিনগুলি : পর্ব-০৩

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

 (গত পর্বের পর) : পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারী আবারো হরতাল এবং গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন সংবাদপত্রে ৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত ও ১৮০ জনের গ্রেফতারের খবর ছাপা হয়। রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে। সচিবালয়ে কোন কাজকর্ম হয় না। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সারাদেশে, শহর ও গ্রামে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন-সংগ্রাম। অন্যদিকে চলতে থাকে দমন-পীড়ন। রাজনৈতিক নেতাদের অনেককেই তখন গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু এতেও মাতৃভাষার দাবীতে বাঙালীর আন্দোনল স্তব্ধ করা যায়নি। এমতাবস্থায় ২৪ শে ফেব্রুয়ারী গভর্ণর ফিরোজনুন বিশেষ আদেশ বলে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দেন। নূরুল আমিন সরকারের পতন ঘটলেও রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আমাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে আরও বহুদিন, বহু মাস, বছর। তবে ৫২-এর সেই রক্তঝরা ২১ ফেব্রুয়ারী হয়ে ওঠে গোটা বাঙালীর শোক, স্মরণ ও সংগ্রামের দিন।

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
একুশে ফেব্রুয়ারী
আমি কি ভুলিতে পারী”

এই গান, এই চেতনা আন্দোলিত, আবেগ স্পন্দিত করে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের সব শ্রেণীর মানুষকে। প্রতিবছর দেশব্যাপী বেসরকারীভাবে উদ্যাপিত হতে থাকে শহীদ দিবস ২১ শে ফেব্রুয়ারী।

বায়ান্ন থেকে একাত্তর : বায়ান্নর ভাষা সংগ্রামের পথ ধরে আসে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়। ফ্রন্ট নেতাদের অনৈক্য এবং পশ্চিম পাকিস্তানী ষড়যন্ত্রে শেষ পর্যন্ত যুক্তফ্রন্ট সরকার টিকে থাকতে পারেনি। দেশে জারি হয় সামরিক শাসন। ইস্কান্দার মির্যার পরে ক্ষমতা গ্রহণ করেন আইয়ুব খান। আইয়ুব খান পাকিস্তানে চালু করেন বেসিক ডেকোক্র্যামি বা মৌলিক গণতন্ত্র। এরই মধ্যে ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলনে প্রকম্পিত হয় বারা বাংলাদেশ। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান যখন এগিয়ে যাচ্ছিলো এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে, তখন সংগ্রামী ও আপোষহীন কোন মহান নেতার আবির্ভাবের অপেক্ষায় যেন প্রহর গুনছিল সাড়ে ৭ কোটি বাঙালী। বাঙালীল সেই কাংক্ষিত আরাধ্য নেতা আর কেউ নন, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যেমন তার বাহ্যিক সৌন্দর্য, তেমনি ভেতরের। তার কথায় মানুষ মুগ্ধ হয়ে গেল। এই বাঙালী নেতার সঙ্গে আমার (লেখকের) প্রথম দেখা হয় খুলনা সার্কিট হাউজে।
তখন ১৯৭১ সাল। দেশের পরিস্থিতি খুব উত্তপ্ত। সভা-সমাবেশ, মিছিলে সরগরম। পাকিস্তানী শাসকদের অন্যায়-অত্যাচার যেন দিন দিন বেড়েই যেতে লাগল। নিরীহ বাঙালী যেন কোনঠাসা হয়ে পড়ল। এমন পরিস্থিতিতে তেঁতুলিয়া থেকৈ টেকনাফ পর্যন্ত শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন। সত্তরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগকে সরকার গঠন করতে দেয়া হচ্ছে না। আলোচনার নামে চলছে প্রহসন। মানুষের ধৈর্য্যরে বাধ ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম। ঢাকাসহ সারাদেশে রাজপথ-ময়দান সবখানে মিছিল-সমাবেশ আর মিছিল। শ্লোগানে-বিক্ষোভে মুখর সারা বাংলাদেশ। চারদিকে এক আওয়াজ ধর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। এমন পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আমাদের মহান নেতা, প্রিয় বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের। আজও তার সেই বজ্রকণ্ঠ আমার কানে বাজে। যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরো, রক্ত যখন দিয়েছি; রক্ত আরো দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।
তার এই ভাষণ যেন কোন ভাষণ নয়, বরং সাড়ে ৭ কোটি জনতার মনের কথা। এ যেন কোন স্বপ্ন পূরণের ইঙ্গিত। জাতি যেন চরম খরায় এক ফোঁটা পানির ছোঁয়া পেল। সকলেই তাদের প্রিয় নেতার ভাষণকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে নিল। সংকল্প করল দেশকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। চারদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাষনের প্রভাব। প্রতিদিন মিটিং-মিছিল চলতে থকাল। স্বাধীনতাকামী মানুষ বিভিন্ন থানার অস্ত্রাগার ও দোকানটাট হতে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করতে লাগল। আওয়ামীলীগের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে আমিও আমার প্রচারণা ও মিটিং-মিছিল চালাতে লাগলাম। এরই মেধ্যে বঙ্গবন্ধুর কাছে আমার ডাক পড়ল। আমি তার বাড়ীতে গেলাম।

(বলবে———-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।