সর্বশেষঃ

রক্তঝরা দিনগুলি : পর্ব-০১

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিররত্ন) : যেমন করে শুরু : আমরা বাংলাদেশী। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। পৃথিবীর মানচিত্রের যে জায়গাটুকুতে বাংলাদেশের অবস্থান তা নিতান্তই ছোট। ছোট হলেও এদেশের ইতিহাস বলে অন্য কথা। কারণ আমাদের ইতিহাসে এমন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় আছে যা অন্য কোন দেশের ইতিহাসে নেই। আর তা হল মুক্তিযুদ্ধ। ভাষার জন্য, দেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ বলতে আমরা ১৯৭১-এর সময়কালকে বুঝলেও প্রকৃতপক্ষে এর সূচনা আরও অনেক আগে। এদেশের মানুষ মর্যাদা এবং অধিকারের জন্য লড়াই করে আসছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে। দেশ বিভাগের অব্যবহির পরই শুরু হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যনীতি। এরই প্রেক্ষাপটে ধূমায়িত হয়ে উঠতে থাকে ক্ষোভ। বাঙালি জাতি সাহসী। তারা ভীরু, কাপুরুষ নয়। মুখ বুজে অন্যায় সহ্য করা তাদের ধাতে নেই। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বারবার। এদেশেই জন্ম গ্রহণ করেছেন মাষ্টারদা, সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম, তিতুমীরের মত বহু বীর। পাকিস্তান আন্দোলনে এদেশের মানুষ পালন করেন ঐতিহাসিক ভূমিকা। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর পক্ষাপাতমূলক এবং স্বার্থপর আচরণ দৃষ্টে এদেশের মানুষ চরমভাবে হতাশ হন। প্রথমেই আঘাত আসে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষার ওপর। প্রতিবাদে সোচ্চার হয় বাঙালি। মাতৃভাষার জন্য জীবন দেওয়ার দৃষ্টান্ত দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল, কিন্তু বাঙালি দিয়েছে। তাকে জীবন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে মাতৃভাষার অধিকার।
বাংলাদেশ ছিল তখন পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান রাষ্ট্রের আরেক অঞ্চল পশ্চিম পাকিস্তান। শুরু থেকেই পাকিস্তানের উভয় অংশ শাসক করে পশ্চিম পাকিস্তানীরা। শাসনের নামে তারা অন্যায্য ও অন্যায়ভাবে জুলুম করেছে বাঙালি জাতির ওপর। ফুটপাত থেকে অফিসপাড়া-সবখানে অরাজকতা ? সবক্ষেত্রেই বাঙালি অবহেলিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ৭ মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় প্রদত্ত ভাষণে পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এই কথা শোনার পর নবগঠিত পাকিস্তানের জাতির পিতা যিনি ছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তার বিরুদ্ধে ঢাকার মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ছাত্র সমাজ বলে ওঠে না, না, না। আমরা বাঙালি, তাই আমাদের রাষ্ট্রভাষাও হবে বাংলা। উর্দুকে কোনো মতেই মেনে নেয়া যাবে না।
১৯৪৯ সালে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগের বিরোধী শক্তি হিসেবে মানকী শরীফের পীর সাহেব, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিমলীগ নামে রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ করে। আমি তখন পাকিস্তান মহিলা জাতীয় রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার ও ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলাম। আমি খুলনায় থাকলেও ঢাকায় এবং দেশের কোথায় কী হচ্ছে তার খবরাখবর জানতে পারতাম। ১৯৫২ সালে জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিম উদ্দিন। পল্টনে ২৬ শে জানুয়ারী ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি দম্ভের সঙ্গে সেই প্রসঙ্গ টেনে এনে বললেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ফলে পূর্ব বাংলার ছাত্র জনতা এবং রাজনীতিকরা স্বাভাবিকভাবেই নাজিম উদ্দিনের এই দম্ভোক্তিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করল। ৩দিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৩১ জানুয়ারী মাওলনা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় সর্বদলীয় সভা। এ সময় আমিও চুপ থাকতে পারলাম না, কাগজ কলমে প্রতিবাদ জানালাম–

(চলবে——-)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।