মধ্যরাত : পর্ব-২৮২

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : ভোর হল, ডোরা আচ্ছন্নের মত ঘুমিয়ে পরল। আমি একা একা আর কি করব। ওর কপালে মাথায় আইস ব্যাগটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধরলাম। মাঝে মাঝে ওর হাত খানা আমার হাতে নিলাম। ওর হাতের রেখাগুলো পর্যবেক্ষণ করলাম। যদিও আমি হাত দেখতে জানিনা। তবু আজ যেন ওর হাতখানা বার বার আমি হাতে নিয়ে নাড়া চাড়া করলাম। কোমল মসৃন ঠোট দুটু জ্বরের তাপে শুকিয়ে শুটকির মত হয়ে যাচ্ছে, আমি তুল ভিজিয়ে ঠোট দুটু মুছে দিলাম। এরিমধ্যে মারিয়া এসে গেল। বলল জ্বর কমেনি ? আমি ঘার নেড়ে বললাম, না। ও থার্মোমিটার লাগিয়ে দেখল জ্বর পাঁচের ঘরে। দুজনে অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললাম, ওকে হসপিটালে দেবার জন্য। মারিয়া পরিচিত একটা হসপিটালে মারিয়া ওকে রাখতে চাইল, কিন্তু ডোরা হসপিটালে যেতে চায় না। ভার্জিনিয়া ভার্সিটির একটা হসপিটালে ওকে বুঝিয়ে সুজিয়ে রাখার মনস্থির করে ফেললাম। ওকে বললাম, তোমার চেকআপ হওয়া দরকার।
মারিয়াই তার পরিচিত লোকজন দিয়ে ওর যত্ন-আত্মির ত্রুটি করলনা। আমি গাড়ী ড্রাইভ করে ওকে হসপিটালে নিয়ে গেলাম। কতবড় বড় ডাক্তার। কত সুন্দর বেড, কত সুন্দর এদের আয়োজন, কত সুন্দর এদের ডিসিপ্লিন, প্রসংশা করার মত। ডোরা বেডে শুয়ে শুয়ে কাঁদতে লাগল। আমি বললাম, ডোরা তুমি এত ছেলে মানুষ, বাচ্চা মানুষের মত হসপিটাল ভয় পাও, ডাক্তার ভয় পাও। দেখলে হাসি পায়। আমি ডোরার বাড়ী থেকে সকালে একবার বিকালে একবার যেয়ে ঘণ্টা তিনেক করে থাকি। মারিয়াও ঐ রকম করে। এরিমধ্যে ডোরার জ্বরের তাপ একটু কমেনি। জ্বর আরও বেড়েই চলছে। ওর কণ্ঠস্বর কেমন ভাঙ্গতে লাগল। হাত, পা কেমন অবশ অবশ ভাব। তবু ডোরাকে কিছু না বলে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করলাম। ডাক্তার আমাকে জানাল ডোরার ম্যানেনজাইটিস। আমি চমকে গেলাম হায় ভগবান, মারিয়াকে আমি বললাম- ডোরাকে আমি কিছু জানতে দিলাম না।
ডোরাকে একদিন সকালে এসে বললাম, ডোরা ইরাকে একটা খবর দেই ? বলে ওর চোখের পর চোখ রাখলাম। ডোরা বলল কেন ? ও কলকাতায় আছে পাসপোর্টের হাঙ্গামা, ভিসা পাবে কিনা আর তুমি আছ, মারিয়া আছে, এতেই চলে যাবে। আমি বললাম, তবু তোমার নিজের বোন। ডোরা অনেকক্ষণ আমার চোখের দিকে চেয়ে থাকল। চোখদুটু অসম্ভব লাল, যেন রক্তে টগ-বগ করছে। ডোরা বলল- তার করে দাও, বা ফোন কর। আমার-ত বাবা-মা নেই ডাক ওকে। আমি ভয়ানক মুসরে পরলাম। ইরাকে ডোরার বই থেকে ফোন নম্বর নিয়ে জানালাম। দিদি অসুস্থ্য, বেশী অসুস্থ্য, তাড়াতাড়ি এস। নাম দিলাম প্রশান্ত।
ডাক্তাররা ভয়ানক চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু রোগের কোন উপশম দেখছিনা। ডোরার কাছে বসে বসে সকাল-বিকাল ডোরার হসপিটালের জানালা দিয়ে দিগন্তের দূর নীলিমার অপরূপ ছবি দেখি। নিঃসীম পাহাড়ের নিস্তব্ধ ঢেউ খেলানোর আঁকা-বাঁকা সরু পথগুলি। আকাশে তখন সন্ধ্যার চাঁদ উঠে অসংখ্য তারা সোনার বুটির মত আকাশের গায়ে লেপটে থাকে। সারাদিনের শ্রমে ক্লান্ত পাখীরা তখন নীড়ে আসে। সমস্ত শহরের নিয়নের বাতিগুলি ঝিক ঝিক করে জ্বলে উঠে এক মায়াবী রাত সৃষ্টি করে। আমি ডোরার রোগক্লান্ত হাত খানা নিয়ে নাড়া চাড়া করি। বড় বড় ডাগর ডাগর চোখগুলো বুজে থাকে। বড় বড় চোখের পাতাগুলোর উপর দৃষ্টি রাখি, লাল ঠোট দুটু আমার এককালে বড় প্রিয় ছিল, তার দিকে অপলকভাবে চেয়ে চেয়ে ভাবি জীবন-যৌবন কিছুই চিরস্থায়ী নয়।
(চলবে—————)
