মধ্যরাত : পর্ব-২৭৭

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),
(গত পর্বের পর) : আনন্দের অশ্রুতে আমার কণ্ঠ রোধ হয়ে আসছিল। কল্পনায় অনেক অনকে দূরের জগৎকে কোন ঐশ্বরিক শক্তিতে আমার মন কাছে টেনে এনেছিল এক অজানা স্বপ্নের জগৎ। আমি যেন তখন এই পৃথিবীতে ছিলাম না। চন্দ্র, সূর্য্য, গ্রহ, তারা, নক্ষত্রের সাথে ভিন্ন জগতে বিচরণ করছিলাম। আমার মনের আকুতি, মিনতি কাতর প্রার্থনা নিয়ে। উমা এসে বলল- দাদা একি খাবেন না; এমনি চুপচাপ বসে আছেন ? উমার কথায় আমার যেন টনক নড়ল। তাইত আমাকে খেতে হবে, বাঁচতে হবে। কাপড় হাতে করে ¯œানের ঘরে ঢুকলাম। ¯œানের ঘরে ঢুকে যেন আমার আনন্দ আর আজ ফিরে আসছে না। অর্কিড এর দুটো জল ভরা সজল কাজল চোখ, আমার চোখের সামনে হাজারো আকুতি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তুব কোন রকম গা ধুয়ে এলাম। ঘরে থেকৈ বেশ বাস ঠিক করে খেতে বসলাম। খেতে খেতে যেন তেমন ভাল লাগছিল না। উমা বলল- দাদা তোমার শরীর খারাপ ? বললাম, না। বিকেলে দোলার ওখানে যাবে না ? বললাম, যাব।
একটু ঘুমের জন্য বিছানায় গেলাম। কিন্তু সে বিছানা আমাকে আরাম দিতে পারে নি। অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করলাম। চোখ দুটো বুজে থাকতে চাইলাম। কিন্তু তবু ঘুমের কোন সন্ধান মিলল না। উমা এসে বলল, যাবে না দাদা মেটানিটিতে ? বললাম তৈরী হও। আমি উঠে হাত মুখ ধুয়ে কাপড় পড়ে দোলার কাছে যাবার জন্য মনস্থির করে ফেললাম। নীচে নেমে গাড়ী বার করলাম, উমা গাড়ীতে বসল। গাড়ী স্টার্ট নিলাম, কিছুক্ষণের মধ্যে মেটানিটি যেয়ে উপস্থিত হলাম।
দোলা অনেক সুস্থ হয়েছে, কচও দোলা বসে বসে রাজ্যের গল্প করে, ছোট বাচ্চাটাও একটু পিট পিট করে দেখছে। আমি এখঅনে এসে ওদের দেখে খুশী হলাম। মনের হতাশা, ব্যর্থতা, দৈন্যতা, অনেক অনেক কমে গেল। আনন্দ ঘর মানুষের সমাবেশে এসে মানুষের মনও অনেক বদলে গিয়ে আনন্দের রস গ্রহণ করে। দেখি অমিয়, বিজন, সুশীল, দেবতোষ ওরা সকলে উপহারের সরঞ্জাম হাতে করে দোলার রুমে ঢুকে পরল। সকলের মুখে পরিপূর্ণ আনন্দের আভাষ, সাথে ওদের স্ত্রীরাও এসেছে, এতগুলি মানুষ এই ছোট ঘরের মধ্যে আমি অমিয় বিজনকে বাইরে ডেকে নিয়ে এলাম। ওদের বৌরা বাচ্চার রুমের কাছে যেয়ে অবাক হয়ে নুতন বাচ্চাটাকে দেখছে, দেখলে যেন মনে হয় কোন কালে তারা আর সদ্য শিশু দেখেনি। অমিয়, বিজন, সুশীল, দেবতোষ ছোট শিশুকে দূর থেকে দেখে আনন্দ পেল। আমি বললাম, হ্যাঁরে দোলা আর বাচ্চার জন্য নতুন কিছু কিনতে হবে না। অনেক সুন্দর জামা, পেন্ট, তোয়ালে, সুট, সাবান, বেবী পাউডার, বেবী ফিডার, নানা রকমের সকলেই খুশীর বারতা বয়ে এনেছে শুভ আশির্বাদের সদ্য আগত নবীন শিশুর জন্য। লাখো লাখো আনন্দ যেন একটা কচি চির নতুন শিশু জন্ম গ্রহণ করে বয়ে নিয়ে আসে সারা পৃথিবীর জন্য। সে আনন্দে যেন সকলের মনে চির নতুন আনন্দ দেয়। একটি নিষ্পাপ কচি মুখ যেন সকলের প্রিয়, সকলের আকাঙ্খার বস্তু। মায়ের মন কত আশা আনন্দে ভরে উঠে ভবিষ্যতের অলীক স্বপ্নের সম্ভাবনা নিয়ে। কত কত নব সম্ভাবনার বীজ বোনে তাকে পরিপূর্ণ মানুষ করে তোলার দায়িত্ব। এ নিয়ে গড়ে উঠে একটা সংসার, সমাজ, সমাজের অগনিত মানুষের জীবন।
আমি নিজে সংসার না বাঁধলেও আমি সব বুঝি, সব জানি। জানি বলেই মানুষের আনন্দে আমি আনন্দিত। মানুষের দুঃখে, কষ্টে, ব্যথায়, বেদনায়, আমি মর্মাহত। অশরীর মানুষের অশরীরী আত্মা আমার দুয়ারে এসে কাঁদে। গভীর রাতে যখন আমার ঘুম আসে না বলে এপাশ-ওপাশ করে রাত কাটাই, তখন মনে হয় ভূখা, নেংড়া, ক্ষুধাতুর ক্ষীণকায়া আমার দুয়ারে আর্তনাদ করছে। কোন অশরীরী আত্মা আমায় ডাকছে, আমি স্থির থাকতে পারি না। ছুটে যাই, দরজা খুলে ওদের খুঁজি। কই কোথায়ও কাজে দেখিনা, মাঝে মাঝে মনে হয় মরিচিকা। এ আলেয়া, এ স্বপ্ন, এ কল্পনা। আমি কি তাদের জন্য কিছু করতে পেরেছি ? না, তবু অনুভব করি, অনুভূতির স্পর্শ দিয়ে, অনুবেদনার পরশ দিয়ে, অনুরাগের ভালবাসা, ¯েœহ দিয়ে, তাদের জড়ায়ে রাখতে চাই, সেবার আদর্শ দিয়ে। নিজের ভোগে কোন আনন্দ নেই। এটা যেন আমি আজ মর্মে মর্মে অনুভব করি। ত্যাগ, মহত্ত, তিতিক্ষা মানুষকে সত্যের সন্ধান দেয়। সে সন্ধ্যান চির অমৃত্যের। সর্বহারার মাঝে আছে ভগবান। ক্ষুধাতর এর মাঝে আছে, ইশ্বর। নেংড়া-খোঁড়া রিক্ততার মাঝে আছে আল্লাহ। চোখের জলের মাঝে গড। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বিভিন্ন ভাবে তাকে ডাকে। সে সর্বত্র সব ধর্মের মাঝে বিরাজ করছে, সে অনন্ত, অসীম, প্রেমময়।
(চলবে——–)
