সর্বশেষঃ

ভোলা পৌর সভার আসন্ন নির্বাচন ও পৌর সভার করনীয় প্রসঙ্গে

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম একটি স্তর হলো পৌরসভা। দেশের মোট পৌরসভার সংখ্যা ৩১১টি। পৌরসভা গঠনের শর্ত হিসেবে ১৯৭৭ পৌরসভা অধ্যাদেশ আইনে বলা আছে, কোন এলাকাকে পৌরসভায় উন্নতি করতে হলে ঐ এলাকার কমপক্ষে ৮০ শতাংশ মানুষ অকৃষিজীবি হওয়া প্রয়োজন। এখন কথা হলো ভোলা পৌরসভা একটি প্রাচীন পৌরসভা। এই পৌরসভা ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠাকালীন সীমানা পরিবর্তন হয়ে কয়েকবার সীমানা বর্ধিত করা হয়েছে। বর্তমানে ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে ভোলা পৌরসভা গঠিত। মোট ভোটার সংখ্যা ৩৭২৪৩ জন। পুরুষ ভোটার ১৮৫৭১ জন, মহিলা ভোটার ১৮৬৭২ জন।
ইতিমধ্যে নতুন করে ভোলা পৌরসভার আয়তন বর্ধিত করে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে বলে জানা যায়। নতুন বর্ধিত অংশ এর মধ্যে পৌরসভা সংলগ্ন বাপ্তা ইউনিয়ন, চরসামাইয়া ইউনিয়ন, আলীনগর ইউনিয়ন, শিবপুর ইউনিয়ন ও ধনিয়া ইউনিয়ন এর অংশ রয়েছে। প্রস্তাবিত বর্ধিত এলাকাসহ ভোটার সংখ্যা দাড়াবে এক লক্ষের উপর।
একটি বিষয় লক্ষনীয় যে, বর্ধিত অংশের অধিকাংশ বাড়ী-ঘর টিনের চালার ঘর এবং তাদের নীরবশীলতা কৃষি কাজের উপর। এ সমস্ত এলাকায় কোন পাকা ইমারত বা অফিস আদালত নাই বল্লেই চলে। কৃষি জমি নির্ভর নিন্ম আয়ের মানুষদের এলাকা কেন ? কি কারণে ? পৌর এলাকা হিসাবে অন্তরভূক্ত করা হলো তা জনগণের বোধগম্য নয়। এদের উপর পৌর টেক্স ধার্য্য করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বর্তমানে পৌরসভা নিজস্ব আয়ে চলতে পারে না। কারণ পৌরসভাধীন এলাকায় অফিস আদালত এর অব কাঠামো পর্যাপ্ত নয়। ভোলা পৌরসভা এলাকায় যে সমস্ত সরকারী অবকাঠামো ও অফিস হতে পারতো তার একটা বিরাট অংশ ভোলা দৌলতখান উপজেলাধীন বাংলাবাজারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো- যুব উন্নয়ন অফিস ও ট্রেনিং সেন্টার, পল্লী বিদ্যুৎ এর অফিস, এতিমখানাসহ অন্যান্য স্থাপনা।
বর্তমানে পৌরসভাধীন মার্কেট সহ সরকারী ও বে-সরকারী অবকাঠামো অত্যন্ত সীমিত। রাস্তা-ঘাট এর সংখ্যাও পর্যাপ্ত নয়। যার ফলে ভোলা পৌরসভার যে বাজেট তাতে সরকারী অনুদান বাদ দিলে, নিজস্ব আয় এর তহবীল খুবই সীমিত। যার ফলে পৌর এলকাধীন রাস্তা-ঘাট মেরামত ও নির্মাণ করা কষ্টকর হয়ে উঠেল। নিজস্ব যে আয় তাতে ঠিকমত পৌরসভার স্টাফ সেলারী প্রদান করাও যাচ্ছেন। এছাড়া একটি ঋণ দানকারী সংস্থা থেকে ঋণ করে বিশাল পৌর ভবন নির্মাণ করার ফলে ঋণের সুধ ও কিস্তির টাকা পরিশোধে হিমসীম খেতে হচ্ছে।
পৌরসভার বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা জানতে পারি ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় অভিবক্ত বাংলায় ১১৮টি মিউনিসিপ্যাল বোর্ড ছিল। তার মধ্যে ভোলা পৌরসভা একটি। পরবর্তীতে আইউয়ুব খান এর শাসন আমলে বেসিক ড্যামোক্রেসী অর্ডার ১৯৫৯ এর অধিনে স্থানীয় সংস্থা ছাড়াও ইউনিয়ন ও টাউন কমিটি গঠন করা হয়।
বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালে পি,ও অর্ডার-৭ এর মাধ্যমে সকল স্থানীয় পরিষদ বাতিল করে তার পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। তখন ইউনিয়ন কমিটিকে নগর পঞ্চায়েত কমিটি, টাউন কমিটিকে শহর কমিটি এবং মিউনিসিপ্যাল কমিটিকে পৌরসভায় রূপান্তর করা হয়। ১৯৭৩ সালে পি,ও নং-২২ এর মাধ্যমে সরাসরি ভোটে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়। শহর কমিটিকে পৌরসভা আখ্যায়িত করা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯, ৫৯ ও ৬০ নং অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, গঠন ও কার্য্য পরিধি এবং স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা বর্ণিত রয়েছে।
পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে পৌরসভা অধ্যাদেশ ২(২৩) ধারায় পৌরসভার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, যে উক্ত অধ্যাদেশে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নগর স্তরের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব দ্বারা পরিচালিত স্থানীয় শাসন ব্যবস্থাকে পৌরসভা বলে।
পৌরসভার নিজস্ব বাজেট প্রণয়ন, টোল, কর আদায় বিরোধ নিস্পত্তি বিধি প্রণয়ন ইত্যাদি ক্ষমতা রয়েছে। ২০০১ সালে স্থানীয় সরকার আইন/পৌরসভা আইন সংস্কার করা হয়। পৌর সভাকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। যেমন- ক, খ, গ। সে ক্ষেত্রে ভোলা পৌরসভা ‘ক’ শ্রেণীভূক্ত পৌরসভা। ‘ক’ শ্রেণীভূক্ত পৌরসভার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে হলে, এই মূহুর্তে যেই জিনিসগুলি বেশি প্রয়োজন তা হলো নাগরিক সুবিধা ও অধিকারগুলিকে নিশ্চিত করন। রাস্তা ঘাট, বাড়ী, যান চলাচলের জন্য উপযোগি করে নির্মাণ করা। পানি সরবরাহ পাইপ লাইন সম্প্রসারণসহ প্রয়োজনীয় পাম্প হাউজ নির্মাণ ও ওভার হেড টেঙ্কি নির্মাণ জরুরী। এই ক্ষেত্রে সরকার পাবলিক হেল্থ বা জনস্¦াস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সার্পোট নেয়া সম্ভব।
পৌর সভার বিভিন্ন সড়কে সড়ক বাতির জন্য বিদ্যুৎ এর বিল সাশ্রয় করার জন্য সোলার বাতির পোষ্ট বসানো একান্ত জরুরী। এটা এখন ঢাকা মহাখালীসহ বিভিন্ন পৌর সভায় একটি মডেল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। দ্রুত পানি নিস্কাশনের জন্য ড্রেনেজ লাইন ভোলা খালের সাথে সংযোগ করে ভোলা খাল এর সংস্কার কার্য্যক্রম দ্রুত শেষ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ভোলা পৌরসভা ওয়াপদার সাহায্য ও সহযোগিতা নিতে পারে। ভোলা খালের দ্রুত পানি প্রবাহ ও নাব্যতা সচল রাখার জন্য শিবপুর ইউনিয়ন এর ভোলা খালের মাথায় মেঘনার মোহনায় অচল স্লুইজ গেইটটি ভেঙ্গে ফেলে নতুন দুই ব্যাঞ্চের স্লুইজ গেইট নির্মাণ করতে হবে। তা হলেই ভোলা খাল সচল হবে এবং পরিস্কার থাকবে। কারণ মেঘনায় জোয়ার আগে আসে এবং পানির চাপও বেশি থাকে, যার ফলে ভোলা খাল দিয়ে দ্রুত বেগে পানি তেঁতুলিয়া নদীর খেয়াঘাট পয়েন্ট দিয়ে বেড় হয়ে যাবে। এ ছাড়া শহর এর কেন্দ্রে নির্দিষ্ট এক জায়গায় কাঁচাবাজার না রেখে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ছোট ছোট কিচেন মার্কেট তৈরী করার প্রকল্প নেয়া জরুরী।
ভোলা পৌর সভার মূল পয়েন্টে খালি জায়গা নাই বল্লেই চলে। ভোলা পৌরসভার বিভিন্ন প্রকল্প মার্কেট, রিক্সা, অটো, ট্রাক স্যান্ড নির্মাণ জরুরী। তার জন্য কোথাও খালি জায়গা পাওয়া গেলে তা অধিগ্রহণ করা বা ক্রয় করার পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা লক্ষ করছি যত্রতত্র রিকসা, অটো, ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকার ফলে যান বাহন এর জটসহ জনদুর্ভোগ এর সৃষ্টি হয়। এই মূহুর্তে ভোলা পৌরসভাধিন ৫নং ওয়ার্ডের কালিনাথ রায়ের বাজার খালি এলাকায় আধুনিক মার্কেটসহ কিচেন মার্কেট তৈরী করা যেতে পারে।
যুগিরঘোল অথবা ওয়াপদা সংলগ্ন জায়গা ক্রয় করে সেখানে একটি আধুনিক মার্কেট ও কিচেন মার্কেট জরুরী। তাতে করে মুল শহরের উপর চাপ কমে যাবে। পৌর সভার তহবিল সংকুলান না হলে বিকল্প হিসাবে প্রাইভেট পার্টির সাথে পার্টনাশিপের মাধ্যমে প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। বা প্রাইভেট উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে তাদেরকে দিয়ে আধুনিক মার্কেট গড়ে তোলা যেতে পারে।
এর জন্য দরকার একটি মাস্টার প্লান। শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে, দোকান পাটের সাইনবোর্ড এর একটি সংস্কার প্রয়োজন। ইউনিসিকেশনের জন্য বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড এর একটি মাপ নির্ধারণ করা সহ একই ডিজাইন নির্দিষ্ট করে দেয়া যেতে পারে। এছাড়া শহরের সকল পাকা অবকাঠামোর রং একই রঙে রাঙ্গিয়ে দিলে একটা অন্যরকম আবহ ফুটে উঠবে। ময়লা-আবর্জনা যত্রতত্র না রেখে নির্দিষ্ট জায়ঘায় ফেলার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পৌর সভার সিলমোহরকৃত পলিব্যাগ বা পাটের হালকা ব্যাগ নির্দিষ্ট নগদ মূল্যে বাড়ী-ঘরে, অফিস-আদালতে সরবরাহ করা যেতে পারে। উক্ত ব্যাগ এ ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসবে লোকজন। তাতে করে পরিবেশ দুষণ এর হাত থেকে রক্ষা পাবে শহর। যা কিনা একান্ত জরুরী। প্রতি বছর সট-সার্কিটে ভোলা পৌরসভার বিভিন্ন মার্কেটে আগুন লাগার ফলে বিপুল পরিমান জান-মালের ক্ষতির সম্মুখিন হয়। শহরে পানির উৎস না থাকায় ফায়ার সার্ভিস এর পক্ষে আগুন নিভানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর জন্য মার্কেট ও রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে মুল পানি সরবরাহ লাইন এর সাথে তিন ইঞ্চি পাইপ এর পয়েন্ট রাখা একান্ত প্রয়োজন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শহরে প্রতি পাড়া, মহল্লা, মার্কেটে এই ধরনের ব্যবস্থা রাখা আছে।
আধুনিক শহর গড়ে তুলতে এই ব্যবস্থা একান্ত জরুরী। শহরের মধ্যে যে ভাবে ক্লিনিক ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাব গড়ে উঠেছে তাতে করে ক্লিনিক্যাল বর্জ এর জন্য বর্জ ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার। যত্রতত্র এই বর্জ ফেলে রাখার ফলে সংক্রামক রোগ ব্যাধির ব্যপ্তি ঘটছে।
নাগরিকদের অভিযোগ শোনা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য প্রতি ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের জন্য অফিস গৃহ নির্মাণ করা যেতে পারে। পৌর সভার তহবিল শক্তিশালী করার জন্য কর ব্যবস্থাপনা ও আদায় জোড়দার করতে হবে।
শহরের উন্নয়ন সংস্কার ও পরিকল্পনা গ্রহণ এর ক্ষেত্রে পরামর্ম করার জন্য প্রতি ৬ মাস অন্তর পৌর পরিষদ বিশিস্ট নাগরিকদের সাথে মতবিনিময় করতে পারেন। এতে করে উন্নয়নে জনসমপ্রিক্ততা বাড়বে। এই বিষয়গুলি মাথায় রেখেই ভোলা পৌর সভার আগামী নির্বাচনে প্রার্থীদের অংশ গ্রহণ করা উচিত হবে।

লেখক : ফজলুল কাদের মজনু
সভাপতি
ভোলা জেলা আওয়ামীলীগ।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।