সর্বশেষঃ

তিন বছরে বরিশালে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার টন

ভরা মৌসুমেও বরিশাল বিভাগের নদ-নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত প্রধান মোহনাগুলোতে পলি জমে নাব্য কমে যাওয়া, অবৈধ ট্রলিং ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, জ্বালানি ও মাছ ধরার সরঞ্জামের বাড়তি খরচসহ নানা কারণে সংকটে পড়েছেন জেলেরা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইলিশের উৎপাদনে। গত তিন অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন।

মৎস্য অধিদপ্তরের উৎপাদন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টন। পরের বছর তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ মেট্রিক টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আরও কমে হয় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টন। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে এসেছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টনে।

অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ মেট্রিক টন। অথচ এর আগে এক যুগের বেশি সময় ধরে বরিশাল অঞ্চলে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছিল। ২০১০-১১ অর্থবছরে বিভাগটিতে ইলিশের উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ৭৬২ মেট্রিক টন। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।

ইলিশের প্রধান বিচরণক্ষেত্র বরিশাল বিভাগের নদ-নদীতে এখন তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় জেলেদের পাশাপাশি বিপাকে পড়েছেন আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীরা। পটুয়াখালীর মহিপুরের জেলে মো. হারুন বলেন, গভীর চ্যানেলে দুই-তিন দিন ঘুরেও প্রয়োজনীয় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তেল, বরফ ও খাবারের খরচও উঠছে না। ফলে মহাজনের দাদন ও এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বরগুনার পাথরঘাটার ট্রলারচালক ও জেলে আব্দুস সোবাহানের ভাষ্য, আন্ধারমানিক, বিষখালী ও বলেশ্বরের মোহনায় বড় বড় ডুবোচর তৈরি হয়েছে। পলি জমে মোহনা ভরাট হওয়ায় সাগর থেকে ইলিশ নদীতে ঢুকতে বাধা পাচ্ছে। এর সঙ্গে জ্বালানি, জাল ও বরফের বাড়তি দাম এবং অবৈধ জালের ব্যবহার সাধারণ জেলেদের সংকট আরও বাড়িয়েছে।

অভিজ্ঞ জেলে সর্দার মো. সেন্টু ইলিশ কমে যাওয়ার পেছনে আধুনিক ট্রলিং বোটের দৌরাত্ম্যকেও দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব বোট সমুদ্রের গভীর থেকে ছোট-বড় মাছের পাশাপাশি ডিমওয়ালা মা-ইলিশ ও পোনা পর্যন্ত ধরে ফেলছে। এতে সাধারণ ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাজারেও। বরিশাল নগরের পোর্ট রোডের পাইকারি বাজারে এলসি সাইজের ইলিশ প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৯৮ হাজার টাকায়। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম প্রতি মণ ১ লাখ ৮ হাজার টাকা। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৮৫ হাজার টাকায়। ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম প্রতি মণ ৫৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকা।

বরিশাল জেলা মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জহির সিকদার বলেন, আগস্টে ইলিশের ভরা মৌসুমে পোর্ট রোডের আড়তগুলোতে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার মণ মাছ আসার কথা। কিন্তু এখন সব আড়ত মিলিয়ে ৬০ থেকে ৭০ মণ মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। মহিপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য বড় মোকামেও একই পরিস্থিতি।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. হাফিজ আশরাফুল বলেন, ইলিশ গভীর ও স্রোতস্বীনি পানির মাছ। নদীতে পর্যাপ্ত গভীরতা ও পানির প্রবাহ না থাকলে সাগর থেকে ইলিশের নদীতে প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাঁর মতে, উজান থেকে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না থাকায় নদীতে পলি জমছে। এতে প্রধান মোহনাগুলোর চ্যানেল ক্রমেই ভরাট হয়ে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের উপপরিচালক মো. মহসীন বলেন, ইলিশের সংকটের পেছনে নদীর নাব্য কমে যাওয়া এবং নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত জেলের অস্বাভাবিক উপস্থিতি বড় ভূমিকা রাখছে। বরিশাল বিভাগের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সরাসরি সংযোগ থাকা মেঘনা, তেঁতুলিয়া, ভোলা, পটুয়াখালী, আন্ধারমানিক, পায়রা, বিষখালী, গলাচিপা ও বলেশ্বর নদীর তলদেশে পলি জমে চ্যানেল ভরাট হয়ে গেছে।

তাঁর মতে, এসব মোহনায় দ্রুত ড্রেজিং করে নাব্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ ট্রলিং বোট ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু নিষেধাজ্ঞা বা জেলেদের সহায়তা দিয়ে ইলিশের উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হবে না। নদীর স্বাভাবিক গভীরতা, স্রোত ও পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মোহনা রক্ষা, অবৈধ মাছ শিকার নিয়ন্ত্রণ এবং জেলেদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশের জাতীয় সম্পদ হিসেবে পরিচিত ইলিশের উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।