তজুমদ্দিনের চরে ব্লক লিডারের অত্যাচারের বিচারের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন
লালমোহনে কর্মস্থলে দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও পদোন্নতি পেলেন শিক্ষক আবু তৈয়ব

লালমোহন প্রতিনিধি ॥
ভোলার লালমোহন উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু তৈয়ব। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তার কোনো হদিস ছিল না। দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থেকেও তুলতেন নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার প্রভাব খাঁটিয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হওয়ার সুবাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে। এসব অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে কয়েকটি লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়। এসব নিয়ে চরম বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি।
অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- বিদ্যালয়ের ২১৫টি দোকান রয়েছে। ওইসব দোকানগুলো ২০১২ সালে বরাদ্দ দেন সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু তৈয়ব (তখন তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রাধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন)। বরাদ্দের নামে দোকান প্রতি ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। দোকানগুলোর বরাদ্দের চুক্তিতে তার স্বাক্ষর রয়েছে। কেবল এই দোকান বরাদ্দ দিয়েই ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকেও বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন। বিদ্যালয়ের জমি অবৈধভাবে বিক্রির সঙ্গেও সম্পৃক্ততা ছিল তার।
গঠিত তদন্ত কমিটি ২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ মে পর্যন্ত বিদ্যালয়টি সরেজমিনে তদন্ত করেন। তদন্ত শেষে ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হেলাল উদ্দিন ও সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু তৈয়বের একাধিক অনিয়মের তথ্য নিশ্চিত করা হয়। তবে এরইমধ্যে প্রধান শিক্ষক এলপিআর-এ চলে যান। তদন্ত কমিটি সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু তৈয়বকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক না করতে এবং তার বেতন-ভাতা স্থগিত করাসহ তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন।
তবে তদন্ত কমিটির ওইসব সুপারিশ আমলে না নিয়ে গত ১৭ জুন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক-১) এসএম জিয়াউল হায়দার হেনরী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সহকারী প্রধান শিক্ষক আবু তৈয়বকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষমতা প্রদান করেন। এই আদেশ পাওয়ার পরই দীর্ঘ দুই বছর পর প্রকাশ্যে আসেন তিনি। এরপর থেকে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন আবু তৈয়ব।
এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর আবু তৈয়বের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এরপরও আবু তৈয়ব বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছেন লালমোহন সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল। তারা বলছেন, যার বিরুদ্ধে সরাসরি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে তাকে কিভাবে নতুন করে পদোন্নতি দিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়? এখন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে- তিনি দুর্নীতি করেও যেহেতু পদোন্নতি পেয়েছেন তাহলে এখন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠবেন। তিনি এই দায়িত্বে থাকলে লালমোহনের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টি নিজস্ব গৌরব হারাবে, ক্ষুণ্ন হবে শিক্ষার পরিবেশ ও মান।
অভিযোগের ব্যাপারে আবু তৈয়ব জানান, তদন্ত কমিটি কোনো বিষয় জানতে আমাকে ডাকেননি। এছাড়া আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, তখন আমি কোনো আয়ণ-ব্যয়ণ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলাম না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর তদন্ত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে আমার বিরুদ্ধের অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে আমাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে আমি বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত ছিলাম।
এ বিষয়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (মাধ্যমিক-১) এসএম জিয়াউল হায়দার হেনরী বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়। শাস্তি আরোপও করতে পারে মন্ত্রণালয়। যার জন্য তদন্ত কমিটির ওই প্রতিবেদনটি আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তার কার্যক্রম চলমান থাকবে। অফিসিয়ালভাবে অপরাধের ফাইনাল সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সঠিক। তবে ওই তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অভিযোগনামা গঠিত হবে। এরপর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমপর্ণ করার সুযোগ দেয়া হবে। যদি তখন তিনি সন্তোষজনক জবাব দিতে না পারেন তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া তিনি যদি কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকে বেতন-ভাতা ভোগ করে থাকেন তাহলে তিনি তা ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন।
