ভোলায় বেপরোয়া অটোরিকশা

স্টাফ রিপোর্টার ॥
ভোলায় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে শুরু করে সড়ক-মহাসড়ক সব স্থানেই দেখা যাচ্ছে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল। ভোলার রাস্তায় বেপরোয়া হয়ে ওঠা এ যানবাহনের কারণে একদিকে বেড়েছে যানজট; অন্যদিকে দুর্ঘটনাও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। গতকাল বুধবার (২৪ জুন) সকালে ভোলা শহরের ভোকেশনাল রোডে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা দুর্ঘটনায় পতিত হয়। সিসি ফুটেজে দেখা গেছে একটি অটোরিকশা দ্রুত গতিত যাচ্ছি। হঠাৎ করে সামনের দিক থেকে অপর একটি অটোরিকশাকে সাইড দিতে গিয়ে রাস্তার মধ্যে উল্টে যায়। এতে অটোরিকশায় থাকা যাত্রীরা মারাত্মক আহত হন। পরবর্তীতে স্থানীয়রা ছুটে এসে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
প্রচলিত রিকশার চেয়ে দ্রুতগতিতে চলা ব্যাটারিচালিত এ রিকশা এখন ভোলায় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে বাড়তি চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। এমন পরিস্থিতি সত্ত্বেও অনেকটা অদৃশ্য কারণে প্রশাসন যেন নীরব ভূমিকায়।
অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এ যানবাহন ঘিরে তৈরি হয়েছে বহুমুখী সংকট। একদিকে যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি; অন্যদিকে প্রায় ভোলার ২২ লাখ মানুষের মধ্যে খেটে খাওয়া কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। এ বাহন সরিয়ে নিতে সরকারের নতুন পরিকল্পনার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক মতভেদ। রিকশা চালানো একসময় হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কাজ হলেও সময়ের পালাবদলে পায়ের ওপর পা তুলেই সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এর চালকরা। সড়কে অনেকটা গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব কাঠামোগত ত্রুটিযুক্ত বাহন। নেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা। সুযোগ পেলেই ছুটছে উল্টোপথে। ব্রেক ও সাসপেনশন সিস্টেম ভালো না হওয়ায় সহসা ঘটছে দুর্ঘটনা। যানজটের কারণে প্রতিদিন মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। অর্থনীতির হিসাবে যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বিশাল ক্ষতির অন্যতম কারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যানুযায়ী, দেশের সড়কে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২০ লাখ রাজধানীর সড়ক দখল করে আছে। যানজটের পাশাপাশি এসব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এসব যানবাহন চালাতে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ। টাকার হিসাবে যার পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, নিয়ন্ত্রণহীন এ অটোরিকশার যান্ত্রিক সমতা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৫ শতাংশের পেছনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দায়ী। যাত্রী ও পথচারীরা বলছেন, এ রিকশাগুলোয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। আগে অলিগলিতে চলাচল করলেও এখন প্রধান সড়কগুলোয়ও এগুলোর দাপট দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে ওঠা অটোরিকশা ও চার্জিং পয়েন্টকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসা। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা করছে বর্তমান সরকার। অধিকাংশ অটোরিকশাই ট্রাফিক আইন মানে না। এছাড়া অটোরিকশাগুলো রাস্তার যেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামার চেষ্টা করে, যা সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ফলে যানজট বাড়ে এবং মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। পাড়া-মহল্লায় যেসব গলিপথ যানজটমুক্ত ছিল, সেগুলোয়ও এখন প্রধান সড়কের মতোই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে স্থবির। উল্টোপথে চলা, প্রধান সড়কে বেপরোয়া গতিতে চলা, অন্য যান্ত্রিক বাহনকে তোয়াক্কা না করা, কখনো উড়াল সড়কেও উঠে যাচ্ছে এসব রিকশা। আর দুর্ঘটনা তো নিয়মিত ঘটনা।
পরিবহন খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যাত্রী চাহিদার তুলনায় গণপরিবহন কম থাকার সুযোগে ঢাকাসহ সারা দেশে দ্রুত বেড়েছে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা-অটোরিকশা। এসব যানের অধিকাংশের নকশা ও কারিগরি মান যথাযথ নয়। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সংখ্যা বাড়তে থাকায় এগুলো কার্যকরভাবে তদারকি কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সড়ক নিরাপত্তায়। বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।
অটোরিকশা সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গরিবের যানবাহন হিসেবে খ্যাত অটোরিকশায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনলে এর সঙ্গে জড়িতরা বেকার হয়ে পড়বে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার অটোরিকশা সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন কিছু নির্দেশনা দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজ চলছে।
এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ সাইফুল নেওয়াজ বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুস্পষ্ট নীতির ঘাটতি রয়েছে। যেসব ওয়ার্কশপে এসব রিকশা তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো পরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দেড় কোটি মানুষের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার কতটা ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দিতে পারে- এখন সেটিই দেখার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ তিন চাকার মোটরচালিত রিকশাগুলো পুরোপুরি নিরাপদ করা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব। তবে গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মহানগরের বাইরে এগুলো স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ব্যাটারির সঠিক রিসাইকেলিং এবং কঠোর ট্রাফিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই শুধু এ বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
একদিকে সড়ক নিরাপত্তা ও যানজটের দীর্ঘদিনের সমস্যা; অন্যদিকে লাখো মানুষের জীবিকা সবকিছু মিলিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য নতুন রুট পারমিট কতটা কার্যকর হবে- সেটিই এখন দেখার বিষয়। অটোরিকশা খাতের সঙ্গে প্রত্য ও পরোভাবে প্রায় দেড় কোটি মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এ বিপুল জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
