মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা বনাম গুজব সাংবাদিকতা বিভ্রান্তির আড়ালে সত্যের লড়াই
মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা বনাম গুজব সাংবাদিকতা বিভ্রান্তির আড়ালে সত্যের লড়াই

ভোলার মিডিয়া পাড়ায় গত কয়েক দিন ধরে এক অদ্ভুত গুঞ্জন ভেসে বেড়াচ্ছে। যেখানে মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য সব সাংবাদিকতার বিপরীতে—অদৃশ্য প্রতিযোগিতায়, অপ্রয়োজনীয় বিভাজনের দেয়ালে। অথচ সময়ের আয়নায় তাকালে দেখা যায়, বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প। সময় কখনো থেমে থাকে না। নদীর স্রোতের মতোই বদলায় মানুষ, বদলায় সমাজ, বদলায় প্রযুক্তি—আর তার সঙ্গে বদলে যায় সংবাদ বলার ভাষাও।
একসময় খবর ছিল কেবল কাগজের পাতায় বন্দি কিছু অক্ষরের সমষ্টি। এখন সেই সংবাদ জীবন্ত-ভিডিওতে, ছবিতে, শব্দে, লাইভ আপডেটে, ডেটা বিশ্লেষণে, আর মানুষের অনুভূতির গভীরে। এই পরিবর্তনের নামই মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা—যেখানে সত্য কেবল বলা হয় না, দেখানো হয়; অনুভব করানো হয়। কিন্তু প্রতিটি আলোর পাশে যেমন কিছু ছায়া থাকে, তেমনি এই পরিবর্তনের সুযোগে জন্ম নিয়েছে নতুন ভয়ংকর বিভ্রান্তিও।
ভিউয়ের নেশায় মত্ত কিছু অনিবন্ধিত ফেসবুক পেজ, নামধারী তথাকথিত মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত মিথ্যা, অতিরঞ্জন আর গুজবকে “ব্রেকিং নিউজ” সাজিয়ে মানুষের মনে ভয়, বিভ্রান্তি আর অবিশ্বাসের বীজ বুনছে। মানুষের আবেগকে পুঁজি করে তারা যেন তথ্য নয়, আতঙ্ক বিক্রি করছে; সত্য নয়, উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।
দুঃখের বিষয় হলো-এরা নিজেদের “মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক” পরিচয়ে উপস্থাপন করলেও প্রকৃত সাংবাদিকতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সাংবাদিকতা নয়, বরং এক ধরনের “শিকারি অপসাংবাদিকতা”—যেখানে খবরের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্লিক, সত্যের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় ভিউ, আর দায়িত্ববোধ হারিয়ে যায় অর্থের ক্ষুধায়।
আমাদের একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে—গুটিকয়েক ভুয়া ও অনিবন্ধিত পেজের অপকর্ম কখনোই পুরো মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। যেমন একজন ভুয়া চিকিৎসকের কারণে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না, তেমনি কিছু দায়িত্বহীন সাংবাদিক নামধারী কনটেন্ট নির্মাতার কারণে প্রকৃত সাংবাদিকতার মর্যাদাও খাটো হতে পারে না।
বিশ্বের সমাদৃত নিউজরুমগুলোতে সব সময় একটা প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ-“মানুষ কি শুধু খবরটি পড়বে, নাকি অনুভবও করবে?” এখানেই মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতার সৌন্দর্য। ধরুন, শুধু লিখলেন “যুদ্ধে একটি শহর ধ্বংস হয়ে গেছে।” পাঠক জানবে। কিন্তু যখন ধ্বংসস্তূপের পাশে পড়ে থাকা শিশুর ভাঙা খেলনা, কিংবা এক মায়ের নীরব কান্না ক্যামেরার ফ্রেমে উঠে আসে-তখন সংবাদ আর কেবল তথ্য থাকে না, হয়ে ওঠে মানবতার আর্তনাদ। এটাই মাল্টিমিডিয়ার শক্তি মানুষকে শুধু জানানো নয়, ভাবানো।
তবে কি লেখার শক্তি কমে গেছে? কখনোই না। বরং শব্দের দায় আরও বেড়েছে। কারণ একটি দায়িত্বশীল লেখা শুধু খবর দেয় না; সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য শেখায়, প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে, সমাজকে সচেতন করে। আরেকটি বাস্তবতাও আমাদের মনে রাখতে হবে-সামাজিক মাধ্যম যত শক্তিশালী হোক, সেটি কখনো পেশাদার গণমাধ্যমের বিকল্প হতে পারে না। কারণ সামাজিক মাধ্যম খবর ছড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু আস্থা তৈরি করে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। যে সংবাদমাধ্যম পাঠকের বিশ্বাস অর্জন করে, যার ওয়েবসাইটে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফিরে আসে প্রকৃত শক্তি সেখানেই।
এখনই সময় অপসাংবাদিকতা, ভুয়া প্রচারণা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ছড়িয়ে সমাজে আতঙ্ক, বিভাজন ও বিভ্রান্তি তৈরি করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। কারণ এটি কেবল সাংবাদিকতার সংকট নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং তথ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। সময় বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে, মাধ্যমও বদলাবে। কিন্তু সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড কখনো বদলাবে না সত্য, দায়বদ্ধতা ও মানুষের আস্থা। শেষ পর্যন্ত জয় তাদেরই হবে, যারা মানুষের বিশ্বাসকে সম্মান করতে জানে।
লেখক : মো: সামিরুজ্জামান
সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী।
