সর্বশেষঃ

জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৩৩

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : চৈত্রের এক সোনাঝরা মাধবী সন্ধ্যায় রেশমীর বিয়ে হয়েছিল। কোন তারিখে কোন বছর তা রেশমী একদম বলতে পারে না। কতবার করে স্বামীর কাছে জিজ্ঞাসা করে শুনে রেখেছিল, তা রেশমীর একটু ও মনে থাকে না। কেউ জানতে চাইলে রেশমী তা বলতে পারে না। মাঝে মাঝে রেশমী বড় লজ্জা পায় কিন্তু যারা তাকে জিজ্ঞাসা করে তারা জানে না। এ বিয়ে রেশমী নিজে করেনি এ বিয়ে তার বাপ তাকে দিয়েছে, তাতেই বোধ হয় তার মনে থাকে না। তার পর আস্তে আস্তে করে আকাশের ভয়ংকর মেঘ কেটে গেল, সূর্য্য আবার বসুন্ধারাকে আলো দান করল- কখন যে, রেশমীর জীবনে যৌবন এসেছিল, আর কখন যে চলে গেল তা আজও রেশমী ভাল বলতে পারে না।
তিন বছর সে বাবার কাছে ছিল, তার স্বামী তখন ঢকায় পড়ছিল। বেশমীর কাছে খেয়াল বশতঃ তখন চিঠি লিখত, কখন লিখত না, রেশমি তখন ছেলেমী বয়সের চিঠি লিখলে আনন্দ পেত না পেলে দুঃখ পেয়ে চুপ করে থাকত। এমনি করে দিনগুলো দুঃখে কষ্টে, চোখের পানিতে চলে যাচ্ছিল। রেশমীর বাবা সাব- রেজিস্ট্রার, কুমিল্লায় তখন তাঁর পোষ্টিং তার একমাত্র মেয়ে রেশমী জামাইকে লেখাপড়ার খরচ দিয়েছিলেন তিনি। ভদ্র লোক বড় অমায়িক ও শান্ত ছিলেন। তারা ৭-৮ পুরুষ থেকে শিক্ষিত ও বুনিয়াদী ঘর, রেশমী ছোট বেলা থেকেই বড় বুদ্ধিমতি ও দুষ্ট প্রকৃতির ছিল। সারা ক্লাশের সেরা মেয়ে ছিল। ওরা যখন খুলনায় ছিল তখন ওর সাথে এক ক্লাশে পড়তাম। তখন ওর বাবা সাব রেজিস্ট্রার ছিল- পরে ডিস্ট্রিক সাব রেজিষ্ট্রার হয়ে বদলী হল। রেশমীর স্বামী রেজা হোসেন তখন রেশমীদের বাড়ী আসা যাওয়া করত। রেশমীর মা ছেলেহীনা ছিল বলে রেজাকে নিজের ছেলের মত আদর করত।
রেজা তখন বি.এ পড়ে, রেজার চাচার রেশমীর বাপের সাথে খুব আলাপ ছিল, সেই প্রথম রেশমীর বাবার কাছে লোক দিয়ে প্রস্তাব দেন, রেশমীর বাবা ইতস্ততঃ করছিলেন, রেজার বি.এ পাশের পর সাব রেজিষ্ট্রার সাহেব একটু একটু আলোচনা করতে থাকেন। সাব রেজিষ্ট্রার সাহেবের নামটা আমার আদৌ মনে নাই। রেজার এম.এ পাসের পর কথাটা দু’দিন থেকেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। রেজাও এগিয়ে এলো। ওদের বিয়ে হলো কিন্তু রেশমী বিয়ের কিছুই উপলব্ধি করতে পারেনি। বার বছরের ছোট মেয়ে বিয়ের সময় রাত অনেক হয়েছিল বলে রেশমী বড় পালংটার উপর ঘুমিয়ে পড়ছিল। শুধু বিয়ের পর তিন বছর সে বাপের বাড়ীতে ছিল। এই তিন বছর বেজার যাওয়া আসার ভিতর বেজাকে যতটুকু চিনতে পেরেছে। রেজা ঢাকার মুসলিম হলের ছাত্র রেজার ছুটিতে আসার সময় হলে রেশমী লুকিয়ে লুকিয়ে রুমালে ফুল তুলে রাখত। রেজা যখন আসত লজ্জায় তার হাতে দিতে পারত না। রেশমী বিয়ের পর খুব নামায পড়ত, রোযা রাখত। সব সময় সে নামায পড়ে পড়ে তার মৃত্যুর জন্য দোয়া করত। মহান স্রষ্টার কাছে। এ পৃথিবী থেকে সে চলে যেতে পারলেই সে নিষ্কৃতি পায় এত দুঃখ, এত কষ্ট তার জীবনে অসহ্য।
বাড়ীর সকলে বেরি বেরি রোগে অসুস্থ হয়ে পড়ল। রেশমীও বাদ গেল না। রেশমরি হাত পা ফুলে গেল অল্প অল্প জ্বর, রেশমী নীরবে সকলের পরিচর্যা করে যায়। রেজা তখন বি.এস.সি পরীক্ষা দিবে বলে শশুরের বাসায় থেকেই পড়াশুনা করছে টাউন থেকে দূরে সাব রেজিস্ট্রার সাহেব জায়গা কিনে বাড়ী নির্মাই করেন। সেখানেই রেজা থাকত, খেত, পড়ভশুনা করত। সকালের নাস্তা ও দুপুরের রাতের খাওয়া বাবুর্চি ও চাকরেরা খানচায় করে বয়ে নিয়ে যেত। প্রত্যেক দিন খাবারের সাথে সাথে রেশমীর চিঠি পেত, আজ ২-৩ দিন ধরে রেশমীর আর চিঠি আসে না। রেজা অবাক হয়ে গেল রেশমী কোনদিন চিঠি না লেখে থাকে না, রেজা বিকেলের দিকে টাউনে বেড়াতে এল, শুনতে পেল রেশমীর অসুখ। রেজা বাড়ীর ভিতর গেল দেখল, সাব রেজিস্ট্রার সাহেব আকুল হয়ে কাঁদছে, রেশমী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে।
যে রেশমীকে কোন দিন ভাল বাসতে পারেনি ঘৃনা তাচ্ছিল্য অবজ্ঞা ভরে তাকিয়েছে, তার জন্য তার হৃদয় যেন কোনখানে সে কষ্ট অনুভব করল, যার মৃত্যু পর্যন্ত সে কামনা করেছিল আজ তাকে ফিরে পাবার জন্য তার মন তাকে বার বার ভিক্ষা জানাল- কিন্তু রেজা নিশ্চল নিশ্চুপ হয়ে, রেশমীর মুখের পানে তাকিয়ে থাকল। রেশমীর মা রেশমী রেশমী করে পাগল হয়ে গেল- লোকে লোকারণ্য। ডাক্তাররা বহু চেষ্টা করছে রেশমীর জ্ঞান ফিরিয়ে আনার জন্য সাব রেজিস্ট্রার সাহেব মেয়ের মুখের পরে বুকের পরে বার বার রেশমীকে ডাকছে। ভদ্র লোকের এর আগে আর একটি মেয়ে, টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়াছে। তখন তার বিয়ের কথা বার্তা চলছিল, আশ্বিন মাসে তার বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করা হয়েছিল। বিধির বিধান বোঝা কড় কঠিন। ভাদ্র মাসে সে মরা গেল। সে দুঃখ কষ্ট আজও সাব রেজিষ্ট্রার ও তার স্ত্রীর মনে দাগ কেটে আছে। একমাত্র রেশমী তাও যদি চলে যায়, তাহলে তারা কি নিয়ে থাকবে।

(চলবে——–)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।