জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-২১

[ ড. টি. এন. রশীদ ]

(গত পর্বের পর) : মিসেস খান বেয়ান সাহেবকে অনুরোধ করেন, মেয়েকে কিছু দিন তার বাড়ীতে বেরিয়ে আসার জন্য। বেয়ান সাহেব বললেন, আপনি ছেলেকে বলুন। তিনি জামাইকে বললেন, জামাই কোন উত্তর দিল না। চুপ করে থাকল। মা এসে গাড়ী পাঠিয়ে দেন, কিন্তু দেখেন মেয়ে একাই এসেছে। জানাই আসে নি। যে কোন উৎসব, অনুষ্ঠানে শত চেষ্টা করে জামাইকে আসা যায় নি। মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলে মেয়ে বলত, ওর কাজ আছে বা শরীর খারাপ। বেশী জোরাজুরি করে জানতে চাইলে কুসুম কেঁদে ফেলত। বলত, ও বাকি তোমাদের এখানে এলে, জামাইর মর্যাদা পায় না। তাই আসতে চায় না।
যদিও জামাই আসত, দেখলো ড্রইং রুমে ভাই-বোন মিলে প্রচুর গল্পগুজব করছে। অমনি বলে উঠলো, বাচ্চাকে ঔষধ খাওয়ানো হয় নি বুঝি? বা এর স্নান হয় নি না? তখন মেয়ে মুখ স্নান করে উঠে যেত। এমন সুন্দর ফুলের মত মেয়ের বিয়ের পর থেকে ওর সুখের হাসি কোথায় যেন হারিয়ে গেল। কোন পাষাণের জেলখানায় হৃদয় বেদীর আত্মাহতি দিল। মিসেস খান মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে শিউরে ওঠে। কুসুম দিন দিন নির্লিপ্ত হয়ে হয়ে আর একটা মেয়ে সন্তানের জন্ম দিল।
কুসুমের মা কিছু বলতে চাইলে বলত মা, তোমরা এর মধ্যে ইন্টারফেয়ার করো না। তোমরা ওকে বা ওদের এক কথা বলবে, আর ওরা আমাকে সশ কথা শুনিয়ে দেবে। তোমরাই আমাকে বিয়ে দিয়েছ, আমি বিয়ে করি নি। মিসেস খান বলতেন, কুসুম, ক’দিন এসে আমার কাছে থাক না? ক’দিন এখানে এসে বিশ্রাম নে। কুসুম মাকে বলত মা তুমি ক’দিন বাবার বাড়ীতে থেকেছ? সব সময়ই তো বাবার কাছে বা আমার দাদা-দাদীর সাথেই তো থেকেছ। আমাকে কেন বলছো তোমার কাছে এসে বিশ্রাম নিতে? মিসেস খান বলত আমার স্বামী, আমার শ্বশুর-শাশুড়ী আমাকে মাথার মনি করে রেখেছেন। শাশুড়ী আমাকে নিজের মেয়ের মত স্নেহ করতেন। দেবর ননদরা আমাকে বড় বোনের মত ভক্তি শ্রদ্ধা করত। আর তাছাড়া তোমার দাদী আমার আপন ফুফু ছিল। তিনি সখ করে নিজের ভাইর মেয়েকে (মা হারা) ঘরে এনেছেন।
আমার ভাই আবার তোমার ফুফুকে বিয়ে করেছে। মিসেস খান, পিছনে ফেলে আসা স্মৃতিচারণ করে মেয়েকে শুনিয়ে বললেন, আমার বাবা তখন সিরাজগঞ্জের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তখনকার দিনে একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের মর্যাদা বর্তমান একজন কমিশনারের চেয়েও বেশি সম্মান ছিল। হাক ডাক ছিল, চার পাঁচজন চাপরাশী ছিল। বাবা স্যুট হেট পড়ে কোর্টে যেতেন। একজন সাধারণ পাবলিক তার সাথে আলাপ করতে ভয় পেত। আমার গানের মাস্টার ছিল। বাসায় সকাল সন্ধ্যায় গানের রিহার্সাল চলত।
আমার মা একদিন হঠাৎ পরপারে পাড়ি জমালেন। মা মারা যাওয়াতে আমি বড় একাকীত্ব ও অসহায় বোধ করলাম। রাতদিন মা’র স্নেহ ভালবাসার কথা মনে করে খুব কান্নকাটি করতাম। তোমার বাবার সাথে তখন আমার বিয়ের কথা চলছিল। তারপর একদিন তোমার বাবার সাথে তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে গেল। তোমার দাদা-দাদীর কাছে এসে তাদের স্নেহ, মায়া-মমতা আর ভালবাসায় আমি আমার মায়ের শোক আস্তে আস্তে ভুলে গেলাম। তারা তাদের মেয়ের স্নেহে অসংখ্য ভালবাসায় আমাকে ঘিরে রেখেছেন। আমাকে মায়ের শুন্যতা বলতে কিছুই বুঝতে দেন নি। আজ এতটি বছর হয়ে গেল তোমার দাদা-দাদি আমার কাছেই থাকলেন। এখন অনেক বৃদ্ধ হয়ে স্মৃতিহীন হয়ে চলার শক্তি হারিয়ে আমার কাছেই আছেন। আমি অদ্যাবধি তাদেরকে বাবা-মার মত সেবা করে আসছি। শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালবাসা দিয়ে তাদেরকে আগলে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
কিন্তু কুসুম, তুমি কিসের তৃষ্ণায়, কিসের মোহে সেখানে পড়ে থাকতে চাও? কুসুম ফ্যাল ফ্যাল করে অবুঝের মত মুখ করে অদৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকত। এমনি করে মা-মেয়ে অনেক কথা হতো। কুসুম কিছুতেই তার স্বামীর কুটির থেকে, তার শ্বশুর-শাশুড়ী ও নিজ স্বামীর ঐতিহ্য নীড় ছেড়ে মার কাছে বাবার বাড়ীতে আসতে কেন যেন দ্বিধা সংকোচ করতো। তার স্বামী তাকে কড়ায় গ-ায় ভাল করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তার মা-বাবা তাকে অবহেলা করে, করুণা করে, দয়া করে। তার স্বামীর অক্ষমতাকে তুচ্ছ করে। তার ছেলে মেয়ে যেন ঐ বাড়ির কৃষ্টি কালচারে ধনীর বিলাসে পরিমার্জিত ও পরিগঠিত না হয়।
মা যতই তার অপরিসীম প্রাণভরা স্নেহ দিয়ে দু’একদিন রাখতে চাইতেন, মেয়ে কিছুতেই ঐ প্রিয়তম স্বামীকে ছেড়ে যেতে চাইত না। মি. খান সব সময় অতি ব্যস্ত, লব্ধ প্রতিষ্ঠিত সিনিয়র ডাক্তার, খুবই ব্যস্ত থাকেন। ডায়াবেটিক সেন্টারের তিনি ডি.জি। আর একটা বিদেশী কোম্পানীর তিনি চেয়ারম্যান। বিকেলে চেম্বারে বসে গ্রীণ সুপার মার্কেটে। সহসা লোকজন তার এপয়েন্টমেন্ট করতে পারে না। অনেক লোক দূর-দূরান্ত থেকে এসে দু-চারদিন হোটেলে অবস্থান করে তারপর তার সাক্ষঅত দিতেন। এমনকি বিনা টাকায় ব্যবস্থা লিখে দিতেন। অতি ভদ্র-অমায়িক-বিন¤্র লোক তিনি। পরিচিত মহলের সকলে তাকে ভালবাসত। (চলবে———–)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।