জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-২০

[ ড. টি. এন. রশীদ ]
(গত পর্বের পর) : বাসায় ফেরার সময় হঠাৎ কোনদিন আমাকে আমার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে চোখে চোখে পড়লেই ভীরু লাজুক দু’টি চোখ সম্ভ্রমে নামিয়ে নিত। আমি কেন যেন ওর চলার পথের দিকে চেয়ে কি ভাবতাম তা আজ আমার মনে নেই। ১৯৭৩ সাল ওদের স্কুল জীবন থেকে আমি ওদের দেখেছি। ১৯৮৪ সাল থেকে আমি বিদেশে আসা-যাওয়া করায় তাদের স্মৃতিচারণ যেন ছিন্ন প্রায়। বিদেশের সিটিজেনশিপ নিয়ে দেশে কিছুদিন বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আর এ পথ দিয়ে কুসুমের চলার গতির টার্মিনাল পড়ে গেল। আমি এখনো আমার বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে তেমনি অপলক নেত্রে লাল গেটটার লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে অগণিত লোকের গাড়ী ও আসা-যাওয়া দেখি। লোক আরো বেড়েছে। লোকের গাড়ী আরো বেড়েছে। কিন্তু কুসুম? কুসুম. কুসুম কোথায়? শুনলাম সকলের মুখে কুসুম অনেক ব্যথা, বেদনার পুঞ্জিভূত মেঘ নিয়ে দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগে একটি ছেলে একটি ছোট মেয়ে রেখে মৃত্যুঞ্জয়ীকে জয় করে পৃথিবী ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে।
আমি শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। তখন পবিত্র কোরআনের বাণীটুকুর কথা মনে পড়ে গেল- প্রত্যেক প্রাণীই মরণশীল। কিন্তু সুন্দর, কোমল কুসুম অকালে চলে গেল। ওর বিয়ের সময় ওকে আমি কমিউনিটি সেন্টারে দেখেছিলাম। সেই স্মৃতি আজও আমার মনের মুকুরে বার বার দোলা দিচ্ছে। বাবার দেওয়া গহনা ওর শরীর ঢেকেছিল। কপালে শ্বেত চন্দনের আল্পনায় ওকে অপরূপ লাগছিল। লাল বেনারসী পড়া, লাল মসলিনের চুমকির মত করা ওড়নায় ওকে যেন স্বর্গের দেবীর মত লাগছিল। বরকে তখন ভিতরে ওর পাশে বসানো হয় নি। লজ্জাবতী লতার মত কুসুম আরো লজ্জায় শরমে কুটি কুটি হয়ে যাচ্ছিল। তখন সকলে খাওয়া দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। বরকে দূর থেকে দেখলাম, লম্বা চওড়া শ্যামলা মিষ্টি মধুর মুখখানা। আচকান, পায়জামায় পাগড়িতে অপরূপ মানিয়েছে।
বরের মঞ্চ অপরূপ সাজানো বন্ধু-বান্ধব তাকে ঘিরে বসে আছে। ওদের রসুমতের সময় পর্যন্ত আমি ছিলাম না। ওটা অল্প বয়সের মেয়েদের পার্ট। ওরাই ওটা সমাধা করবে বলে আমি চলে এসেছিলাম। মিঃ নাসিম অনেক গণ্যমান্য প্রভাবশালী লোকদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। প্রত্যেকে তাঁর নিমন্ত্রণে স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে দাওয়াত রক্ষা করেছেন। কত খরচ, কত সাধ স্বপ্ন বুকে নিয়ে কত আশার সৌধ স্বপ্ন রচনা করে মিঃ নাসিম ও মিসেস নাসিম, মেয়ে বিয়ে দিয়েছে। বছর না ঘুরতেই মেয়ের কোলে নাতি এল। মেয়ে ডাক্তার তখন বোধহয় মেয়ে সবেমাত্র ডাক্তারি পাশ করে পি.জি. হসপিটালে ইন্টার্নি করছে। জামাই আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার। মেয়ের বাচ্চা সামলাতে গিয়ে পড়াশুনার অসুবিধা হয়। তাই মিসেস নাসিম পাকের মেয়ে, বাচ্চা রাখার আয়া হিসেবে মেয়ের শ্বশুর শাশুড়ীর কাছে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু শাশুড়ী তাদের দিয়ে অন্য কাজ করান বা একটা কারণ দেখিয়ে বিদায় করে দেন। মেয়ের কষ্টের সীমা থাকে না। মিসেস নাসিম সবই বুঝলেন, বলতে পারেন না। মেয়ে শ্বশুর শাশুড়ী, দেবর, ননদ, জা নিয়ে সংসার করে। ছোট বাড়ী, তবুও মেয়ে চোখ বুজে সেখানে থাকতে ভালবাসে।
এক ননদের স্বামী বিদেশ থাকেন। প্রচুর টাকা-পয়সা কামাই করে শ্বশুর বাড়ীতে এসে বৌ নিয়ে ধুমধাম খরচ করে খাওয়া-দাওয়া করে। প্রায় সময়ই তার ননদ তার মায়ের কাছে থাকতে ভালবাসে। দেবর ডাক্তার, তার সহধর্মিনীও ডাক্তার। দু’জনই সৌদী আরবে থাকে। প্রচুর টাকার মালিক। ঢাকা এসে বাবা মার কাছে উঠে দু’হাতে পয়সা খরচ করে। কিন্তু কুসুমের স্বামী সে আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হয়েও যা আয় করে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বিদেশ গিয়ে চাকুরী ছেড়ে চলে আসে। কুসুম দোতালায় ছোট একখানা ঘরে শ্বশুর বাড়ীতে থাকে। দুপুর বেলায় স্বামীর ঘুমে বা তার বিশ্রামের অসুবিধা হয় বলে ছোট ঝুল বারান্দায় বসে বসে সময় কাটায়। মিসেস নাসিম মাঝে মধ্যে মেয়েকে দেখতে যান। গিয়ে তিনি সবই দেখেন, সবই বোঝেন, যাওয়ার পথে মেয়ের জন্য অনেক কিছু কেনাকাটা করে নিয়ে যান। দোতালায় মেয়ের সাথে বসে গল্প করেন আর মেয়ের অন্তদৃষ্টি সব অনুভব করেন। ভাল ভাল জিনিষ পত্র যা কিছু ক্রয় করে নিয়েছে তা-ও মেয়ে নীচতালায় জা, ননদ, শ্বাশুড়ীর হাতে তুলে দেয়। মিসেস নাসিম মনে মনে ভেবেছিলেন মেয়ে-জামাই তার দেওয়া সখের খাবার গুলো সময় সাপেক্ষ রেখে খাবে।
(চলবে—–)।
