ডালপালা মেলছে মাঠ রাজনীতি

বিশ্বে মহামারির রূপ পাওয়া করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত মাঠের রাজনীতি আবার ডালপালা মেলছে। স্থানীয় সরকার ও কয়েকটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন ঘিরে জেলা-উপজেলায় সরব হচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। নানা কর্মসূচি নিয়ে দলগুলো প্রস্ততি নিচ্ছে স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনে অংশগ্রহণের। এজন্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দল, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম ঘরানার দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এরই মধ্যে ভালো-মন্দের হিসাব কষতে শুরু করে দিয়েছেন। কোভিড-১৯ ভাইরাস পরিস্থিতিতে রাজনীতির ধারা কেমন হবে এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরছে আওয়ামী লীগ : চলতি মাস থেকেই ব্যাপক সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। প্রাথমিকভাবে বেশকিছু কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতাকর্মীদের এসব নির্দেশনা পৌঁছে দিয়েছেন। গত শনিবার দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক হয় গণভবনে। ওই বৈঠকে করোনার স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আট বিভাগের জন্য আটটি সাংগঠনিক টিম অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা-উপজেলা শাখা সম্মেলনের কার্যক্রম শুরুর নির্দেশও দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিজ নিজ বিভাগের কোন কোন জেলায় সম্মেলন হয়নি তার তালিকা করতে বলা হয়েছে। কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সেগুলোর তারিখ নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বস্তরের কমিটি করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের পর যেন অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের যেন মূল্যায়ন করা হয়। বিশেষ করে দলের ত্যাগী ও বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে এমন নির্দেশনা দেন দলীয়প্রধান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি চাই তৃণমূলে দলের পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাকর্মীসহ সমাজে যারা স্বচ্ছ ভাবমূর্তির মানুষজন আছেন তাদেরও দলে টানতে হবে। তোমরা কাজ করতে গিয়ে কমিটি করতে গিয়ে কোথাও কী সমস্যা হচ্ছে তা আমাকে জানাবে।
এদিকে দলীয় পদ-পদবি পাওয়া ও সামনের স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চাঙ্গা হচ্ছে আওয়ামী লীগের রাজনীতি। দলীয় অফিস, বাজার, চায়ের দোকানসহ সব জায়াগায় সরব নেতাকর্মীরা। পৌর মেয়র ও চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পেতে শুরু হয়ে গেছে গণসংযোগ। কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যাপক কাযক্রম শুরু করেছেন প্রার্থীরা। এলাকায় শোডাউন করতেও দেখা যাচ্ছে। পোস্টার সামাজিক যোগযোগ মাধ্যেমেও প্রচার প্রচারণা চালানো শুরু হয়েছে।
বিএনপিও সরব : ঢাকাসহ বিভিন্ন সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সরব হয়েছে বিএনপির রাজনীতি। নয়া পল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে মিছিল নিয়ে দলীয় মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন। এর আগে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকারসহ সব উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে দলটি। আর এই ঘোষণায় তৃণমূলেও চাঙ্গা বিএনপির রাজনীতি। প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে স্থানীয় পর্যায়ে নানা কর্মকান্ড শুরু করেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের বরাবরই সিদ্ধান্ত ছিল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার। শুধু কোভিড ১৯-এর কারণে গত দুটি উপনির্বাচনে (যশোর ও বগুড়া) যোগ দিয়েও পরবর্তীকালে প্রচারে যাইনি, আমরা সরে দাঁড়িয়েছি। উপজেলা নির্বাচনসহ স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে আমরা অংশগ্রহণ করব সে সিদ্ধান্তই আছে।
চাঙ্গা হচ্ছে জাতীয় পার্টি : দলের অতিরিক্ত মহাসচিবদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা তৈরি করেছে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। সভায় জাতীয় পার্টি মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, জাতীয় পার্টি এখন আরো ঐক্যবদ্ধ। আগামীদিনের রাজনীতিতে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জাতীয় পার্টি মাঠে থাকবে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন আয়োজনে নির্দেশ দেন বাবলু। তিনি বলেন, জাপা করোনার মধ্যে পিছিয়ে নেই। আমরা দলকে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছি। ধীরে ধীরে জেলা-উপজেলার সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত হবে। আমরা মাঠে নামব। এরই মধ্যে ঘরোয়া পরিবেশে দলীয় কার্যক্রম চলছে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের নির্দেশ সময়মতো পৌঁছানো হচ্ছে।
সুত্র জানায়, পৌরসভা নির্বাচনে সারা দেশে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। তবে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বোঝাপড়া হলে জোটবদ্ধ হয়েও নির্বাচনে অংশ নিতে পারে দলটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, পৌরসভা নির্বাচনে সারা দেশে প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করব। সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও জনপ্রিয় এবং যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-অপরাধের অভিযোগ নেই এমন নেতাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা প্রমাণ করব, মাঠ পর্যায়ে জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা আছে, সাংগঠনিক শক্তিও আছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি : জোটগত নয়, দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে দলটি। দলের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, পৌরসভা নির্বাচনে দলীয়ভাবেই অংশ নেব। যেখানে ভালো ও জনপ্রিয় প্রার্থী পাওয়া যাবে সেখানে মনোনয়ন দেওয়া হবে। জোটগত নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে অতীতে অংশ নিইনি। সামনের দিনে নেওয়ার সম্ভাবনাও নেই।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ : চলমান নির্বাচনী পরিস্থিতি দেখে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে দলটি। দলটি মনে করছে, নির্বাচনে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠুভাবে না হলে অংশগ্রহণ করে বৈধতা দেওয়া ছাড়া কোনো লাভ হবে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত না নিলেও দলটি ভেতরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও জনসংযোগ বাড়াতে নির্দেশনা দিয়েছে। কোথায় দলের ও কোথায় বাম গণতান্ত্রিক জোটের প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হলে জয়ী হতে পারবে সেই জরিপ করছে দলটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, নেতাকর্মীদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচনে অংশ নেব কিনা সেটা এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রসঙ্গত, আগামী ডিসেম্বরে পৌরসভা ও মার্চে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পৌরসভার মেয়র ও ইউপির চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় এ নির্বাচনে দলের মাঠ পর্যায়ের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ আসছে। ওই সুযোগ কাজে লাগাতে সব কৌশল নিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর তরফে। তাই নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসবে, দলীয় তৎপরতা ততই বাড়াবে।

সুত্র : প্রতিদিনের সংবাদ।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।