সর্বশেষঃ

জীবনের ডায়েরী থেকে গল্প সমগ্র : পর্ব-৩০

ড. তাইবুন নাহার রশীদ (কবিরত্ন),

(গত সংখ্যার পর) মি. খান ও মিসেস খান মেয়েকে নিয়ে ফিরে এলেন। এবার আর সি. এম.এস.এ. নয়, ধানমন্ডির নিজের ১৮ নং বাসায় যেখানে কুসুম শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত লালিত পালিত হয়েছে। যেখানে হাসিখেলা, গল্প ও রূপকথার আসর বসত। যেখানে মা-বাবার আনন্দের প্রেম কানন দেখেছিল। নিজের জীবন দিয়েও চেয়েছিল এমন একটি প্রেম সুরভিত মঞ্চ তৈরী করতে। কিন্তু কুসুম পারে নি, কুসুম ব্যর্থ হয়ে বিফল মনোরথ হয়ে আবার জীবনের শেষ পর্যন্ত বাবার আশ্রয়ে জীবনের শেষ আয়ু নিয়ে এসে দাঁড়াল।

মা ব্যস্ত হয়ে পড়ল কুসুমের খাওয়া, শোয়া, বিশ্রাম নিয়ে। কুসুম সেদিন বাথরুমে যেয়ে নিজেই স্নান করে এলো। যেমনি আগে দামী সাবান নিয়ে গোসলখানায় অনেক্ষণ সুন্দর করে ঘষে ঘষে গোসল করত। গোসল সেরে ঘরে এলো। মা বললেন, এবার কিন্তু খাও মা। কুসুম বলল, মা তোমরা শুধু খাও খাও বলো, আর আমার শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি আমাকে সি. এম.এস.এ নিয়ে অক্সিজেন দাও। বাবা বাড়ীতে ছিলেন। তিনি নিজে গাড়ী ড্রাইভ করে কুসুমকে নিয়ে শেষবারের মত সি. এম.এস.এ এলেন। ডাক্তাররা অক্সিজেন দিল। কুসুম চোখ বুঝে থাকল। বাবা তার পালস ধরে থাকলেন।

মা অনিমেষ নয়নে কুসুমের কুসুমিত মুখের পানে চেয়ে থাকলেন। এমনিভাবে কুসুম সারাদিন অচেতন অবস্থায় থেকে রাত ৯টায় শুকতারার মত আস্তে আস্তে বিশ্বের বুক থেকে অন্তর্হিত হয়ে গেল। মা কেঁদে বুকে লুটিয়ে পড়ল, কুসুম একবার আমার কোলে আয়। বাবা কেঁদেছে কিন্তু চোখে কোন জল গড়িয়ে পড়ে নি, পাষানের মত হৃদয় শক্ত করে তাকে সবকিছু মোকাবেলা করতে হয়েছে। কুসুমের ডেড গাড়ি বাসায় নিয়ে এলেন। মিসেস খানকে এক রকম জ্ঞানহীন অবস্থায় তুলে আনল। লোক ঠেকানো যায় না। তার বিপদে সকলে আপন আত্মীয়ের মত কাঁদতে লাগল। কুসুম এ পাড়ার সকলের আদরের সামগ্রী ছিল। গোসল দিয়ে কাফন পড়িয়েছে কুসুম, যেন তার বাবার সাজানো ড্রইং টেবিল। তেমনি ফুলের মত ধুপধোঁয়ায়, আগরবাতিতে মৌলভী মাওলানাগণের কুরআন তিলাওয়াতের সুমধুর স্বরে সারা রাত সকলে সঞ্জীবিত করে রাখল।

যোহরের নামাযের সময় হয়ে গেল। কুসুমকে এবার সমাধিস্থ করা হবে। সব আপন লোকজন এসে গেল। কুসুমের মা অচেতন অভস্থায় পড়ে আছে। সকলে শেষ বারের মত তাকে দেখার আমন্ত্রণ জানালে মিসেস খান দৌড়ে এসে লাশবাহী খাট আকড়ে ধরলেন, বললেন, আমার মেয়েকে তোরা নিস না। এভাবে কান্নায় জড়িয়ে পড়েন। তার আর্তনাদে লাশ বহনকারীরা চমকে উঠল।

কবির ভাষায়- যেতে নাহি দিব হায়, তবুও যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়। সকলের উপস্থিতিতে অতি যত্ন সহকারে সাদরে সম্ভ্রমে মর্যাদা সহকারে তাকে সমাধিস্থ করা হলো। কুসুমের সেই নরাধম স্বামী জানাযায় উপস্থিত ছিল। কুসুম পার্থিব সকল জ্বালা যন্ত্রণার ইতি টেনে চলে গেল পরপারে। কিন্তু রেখে গেল বিগলিত ভারাক্রান্ত তার ময়ের হৃদয় শুন্য করে গেল দুটো সন্তানের মায়ের ভালবাসা।

 

(চলবে—————)

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।