সাগরে মাছ নেই, ঋণের বোঝায় বিপন্ন উপকূলের লাখো জেলে

মোঃ সামিরুজ্জামান, সিনিয়ার স্টাফ রিপোর্টার
‘আগে এক ট্রিপ সাগরে গেলে যে মাছ পাইতাম, তা দিয়ে তেলের খরচ উঠিয়াও সাত দিন ভালোভাবে সংসার চলত। আর এহন হাজার হাজার টাকা দাদন নিয়ে সাগরে গিয়াও খালি হাতে ফিরতে হয়। চাল-ডাল কেনার টাকা তো দূরের কথা, মহাজনের ঋণের সুদ দেওয়াই দায় হয়ে পড়ছে। সাগরে মাছ ধরে এহন আর সংসার চলে না বাজান।’
চোখেমুখে ক্লান্তি আর কণ্ঠে হতাশা। কথাগুলো বলছিলেন ভোলার চরফ্যাশনের সামরাজ মাছঘাটের প্রবীণ জেলে নুরহোসেন মাঝি। দীর্ঘদিন ধরে নদী ও সাগরে মাছ ধরে জীবিকা চালানো এই জেলের আক্ষেপ এখন আর একার নয়। চরফ্যাশন ও মনপুরার উপকূলীয় এলাকার বহু জেলের জীবনেই মাছের অনিশ্চিত প্রাপ্যতা, বাড়তি খরচ, দাদন ও ঋণের চাপ একই ধরনের সংকট তৈরি করেছে।
মেঘনা, তেঁতুলিয়া নদী ও বঙ্গোপসাগরের ওপর নির্ভর করে বছরের পর বছর জীবিকা চালিয়ে আসছেন ভোলার উপকূলের জেলেরা। তাঁদের ভাষ্য, একসময় মাছ ধরেই সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি কিছুটা সঞ্চয়ও করা যেত। এখন সাগরে যাওয়ার আগেই জ্বালানি তেল, বরফ, খাবার ও ট্রলারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনতে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। অনেক জেলেকেই সেই অর্থের জন্য মহাজনের কাছ থেকে দাদন বা বিভিন্ন ধরনের ঋণ নিতে হয়।
কিন্তু সাগরে গিয়ে প্রত্যাশিত মাছ না মিললে পুরো হিসাবই উল্টে যায়। জ্বালানি, বরফ ও খাবারের খরচ ওঠে না; তার সঙ্গে যোগ হয় ধার করা টাকার কিস্তি ও সুদ। ফলে একেকটি ট্রিপ শেষ হয় লোকসানে। পরের ট্রিপে যাওয়ার জন্য আবারও ঋণ করতে হয়। এভাবেই ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে বলে জানান জেলেরা।
চরফ্যাশনের চরকুকরি এলাকার জেলে বাবুল মাঝি প্রায় ৪০ বছর ধরে মাছ ধরছেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে মাছ ধরার পেশার অর্থনৈতিক হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় সাগরে গিয়ে মাছ ধরে ভালো লাভ করা সম্ভব হতো। এখন তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রলার নিয়ে সাগরে যাওয়ার খরচই অনেক বেড়েছে। এর ওপর মাছ কম পাওয়া গেলে সেই খরচও ওঠে না। তাই মাছ ধরার পাশাপাশি তাঁকে অন্য কাজও করতে হচ্ছে।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুধু জ্বালানি তেলের দাম নয়, মাছ ধরার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই বেড়েছে। ট্রলারে ব্যবহারের জন্য চাল, ডাল, তেল, বরফ, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম কিনতে আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ সেই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাছের প্রাপ্যতা বা বিক্রির নিশ্চয়তা বাড়েনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাছ ধরার সময় কমে যাওয়ার বাস্তবতা। ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কারণে সরকার নির্ধারিত সময়ে নদী ও সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে নামার পরও ঝড়, নিম্নচাপ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় নিয়মিতভাবে মাছ ধরা সম্ভব হয় না।
জেলে ফোরকান মিয়া বলেন, মাছ ধরার মৌসুম মোটামুটি পাঁচ মাস হলেও এর মধ্যে প্রায় আড়াই মাস নিষেধাজ্ঞা থাকে। বাকি সময়েও ঝড়ঝাপটা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সবসময় সাগরে যাওয়া যায় না। ফলে মাছ ধরার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে সংসার চালানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে তিনিও বিকল্প পেশার কথা ভাবছেন।
তেঁতুলিয়া নদীর পাড়ের জেলে আনোয়ার এবং বেতুয়ার মেঘনা নদীর পাড়ের সামরাজ এলাকার জেলে নুরুল্লাহ মিয়াও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, সাগরে এখনো ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যায়। কখনো কখনো একসঙ্গে ভালো পরিমাণ মাছও ধরা পড়ে। কিন্তু আগের মতো নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় নিয়মিত মাছ পাওয়া যায় না। মাছের সন্ধানে অনেক দূরে যেতে হয়। এতে বাড়ে জ্বালানি তেল, বরফ, খাবার ও অন্যান্য খরচ। শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত মাছ না পেলে পুরো ট্রিপই লোকসানে পরিণত হয়।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের পেশা থেকে সরে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। জেলেরা বলছেন, সাগর থেকে মাছ ধরে ঘাটে ফেরার পর এখন অনেককেই অন্য কাজের সন্ধান করতে হয়। কারণ মাছ ধরার পেশায় একটি ট্রিপ শেষে কত টাকা আয় হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে দিনমজুরি বা অন্য কোনো শ্রমের কাজে গেলে অন্তত দিনের শেষে একটি নির্দিষ্ট মজুরি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই কেউ কৃষিকাজে, কেউ শ্রমিকের কাজে, আবার কেউ ছোটখাটো ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন।
মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া ও জেলেদের ওপর বাড়তে থাকা চাপের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন মৎস্য কর্মকর্তারা। চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণে মাছের উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে নদী ও সাগরে মাছের বিচরণ এবং প্রজনন ক্ষেত্রেও পরিবর্তন হচ্ছে। গত কয়েক দশকে জেলের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সে তুলনায় মাছের উৎপাদন বাড়েনি। ফলে নদী ও সাগরের ওপর মাছ ধরার চাপও বেড়েছে।
জেলেদের আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করতে মাছ ধরার পাশাপাশি বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরিতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান জয়ন্ত কুমার অপু।
ভোলা জেলা মৎস্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাতটি উপজেলায় মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা জেলের সংখ্যা ২ লাখের বেশি। সরকারি ডাটাবেজে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার। নদীতে মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে প্রায় ৮৯ হাজার ৬০০ জন, অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ জেলেকে ভিজিএফের চাল বা সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়। ফলে বাকি প্রায় ৮০ হাজার ৭৪৪ জন নিবন্ধিত জেলে ওই সময়ের চালের বরাদ্দ থেকে সাময়িকভাবে বঞ্চিত থাকেন।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন এমন সমুদ্রগামী জেলের সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার। সমুদ্রের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে তাঁদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার জেলেকে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরির লক্ষ্যে বকনা বাছুর বিতরণ করা হয়েছে।
তবে জেলেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, নিষেধাজ্ঞার সময়ে খাদ্য সহায়তা বা প্রণোদনা পেলেই তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান হচ্ছে না। সাগরে মাছের অনিশ্চয়তা, জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম, দাদন ও ঋণের চাপ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
একদিকে সাগরে যেতে ট্রলারের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত মাছ নিয়ে ঘাটে ফেরার নিশ্চয়তা কমছে। ফলে বছরের পর বছর যে পেশার ওপর নির্ভর করে ভোলার উপকূলীয় মানুষের জীবন ও অর্থনীতি টিকে আছে, সেই জেলে পেশাই এখন অনেকের কাছে অনিশ্চিত জীবিকার প্রতিশব্দ হয়ে উঠছে।
সামরাজ মাছঘাটের প্রবীণ জেলে নুরহোসেন মাঝির দীর্ঘশ্বাসে তাই শুধু মাছ কম পাওয়ার কষ্ট নেই; আছে দীর্ঘদিনের একটি পেশা ও জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখার অনিশ্চয়তাও। তাঁর মতো জেলেদের ভাষায়, সাগরে মাছ না থাকলে শুধু জেলের জালই খালি থাকে না, খালি হয়ে যায় ঘরের হাঁড়িও।
