মেঘনার তলদেশে ছিঁড়ে যাওয়া ক্যাবল, অন্ধকারে ১৫–২০ হাজার মানুষের জীবন

চার বছর ধরে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন ভোলার দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ। মেঘনা নদীর তলদেশে স্থাপিত সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে যাওয়ার পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে বিদ্যুৎ সংযোগ। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। বিদ্যুতের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, অচল হয়ে পড়েছে বহু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত ছিল মদনপুর ইউনিয়ন। পরে মেঘনা নদীর তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের মাধ্যমে ২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো মদনপুর ইউনিয়ন এবং ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝের চর এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। তবে সেই সুবিধা স্থায়ী হয়নি। ২০২২ সালের ২৩ জুন সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে গেলে পুনরায় অন্ধকারে ডুবে যায় পুরো এলাকা। এরপর প্রায় চার বছর পার হলেও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের কাজ শুরু হয়নি।
ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে ভোলা সদরের তুলাতুলি থেকে মদনপুর ইউনিয়ন ও কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝের চর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছিল। প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৮০০ গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ পান।
বর্তমানে বিদ্যুৎ না থাকায় তীব্র গরমে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অনেক পরিবারে ফ্রিজ, টেলিভিশন, ফ্যানসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার সময় ঋণ ও ধারদেনা করে কেনা বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের আর্থিক বোঝাও বহন করতে হয়েছে অনেক পরিবারকে।
মদনপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আরিফ বলেন, বিদ্যুৎ আসার পর ঘরের জন্য ফ্রিজ, ফ্যান, লাইটসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস পরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর আর বিদ্যুৎ ফিরে আসেনি।
৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, অনেক জেলে ও নিম্নআয়ের মানুষ ঋণ নিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম কিনেছিলেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মালেকা বেগম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে শিশুদের নিয়ে দুর্বিষহ সময় কাটাতে হচ্ছে। রাতেও স্বাভাবিকভাবে ঘুমানো যায় না। বিদ্যুৎ আসার পর কেনা ফ্যান ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিও দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে।
নূর জাহান বেগমের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় সন্তানদের লেখাপড়ায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে। সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত আলো না থাকায় তারা বেশি সময় পড়াশোনা করতে পারে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. জামাল উদ্দিন সকেট ও আব্দুল মালেক বলেন, মদনপুরে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষের বসবাস। বিদ্যুৎ চালু হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসায়ী, কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ সবাই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তারা দ্রুত সমস্যার সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন।
শিক্ষা কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে। মদনপুর ইউনিয়নের ১০২ নম্বর চর পদ্মা মকবুল আহমেদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শিহাব উদ্দিন বলেন, বিদ্যালয়ে ১৩৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রচণ্ড গরমে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী গরম সহ্য করতে না পেরে বিরতির সময় বাড়ি ফিরে যায়। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ থাকলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানে মনোযোগ আরও বাড়ত।
এ বিষয়ে ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শাহ্ মো. রাজ্জাকুর রহমান বলেন, সাবমেরিন ক্যাবল ছিঁড়ে যাওয়ার পর বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে জরিপ করা হয়েছে। তাদের মতে, মেঘনা নদীর তলদেশে বর্তমান পদ্ধতিতে সাবমেরিন ক্যাবল টেকসই হচ্ছে না। বিকল্প প্রযুক্তিও আপাতত নেই। তিনি বলেন, ক্যাবল পুনঃস্থাপনে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন, যা প্রকল্প ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
