অস্তিত্ব সংকটে এভারেস্ট জয়ী মুহিতের গ্রাম, হুমকির মুখে ছোট মানিকা মাদ্রাসা

মোঃ রাজিব হায়দার (বিশেষ প্রতিনিধি) ॥ তেঁতুলিয়া নদীর ঢেউ একদিকে সৌন্দর্য, অন্যদিকে আতঙ্ক। ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার গঙ্গাপুর ইউনিয়নের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা এই নদীই আজ গ্রাস করছে এভারেস্ট জয়ী মুহাম্মদ আবদুল মুহিতের শৈশবের গ্রাম। গঙ্গাপুরের মানুষ একদিকে গর্বিত মুহিতের সাফল্যে, আবার অন্যদিকে দিশেহারা নদীভাঙনের ভয়ে। নদী ভাঙ্গনে গঙ্গাপুরের নায়েব বাড়ি, সিকদার বাড়ি, খালদার বাড়ি, আমানুল্লাহ হাওলাদার বাড়ীসহ অসংখ্য বাড়ী নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া গত এক দশকে গঙ্গাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ বসতভিটা, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিনিয়ত ভাঙ্গনের এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে মুহিতের শৈশবের ফেলে আসা সেই গ্রামটি।
এভারেস্ট জয়ীর জন্মভূমি : ২০১২ সালের ২১মে বাংলাদেশের দ্বিতীয় নাগরিক হিসেবে এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন ভোলার ছেলে মুহাম্মদ আবদুল মুহিত। তিনি জন্মেছিলেন এই গঙ্গাপুরেই। একসময় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন একদিন তিনি দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন। মুহিতের সেই স্বপ্ন পূরণ হলেও তাঁর গ্রাম আজ হারানোর পথে।
নদীভাঙনের থাবা : তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনে গত এক দশকে গঙ্গাপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ বসতভিটা, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গঙ্গাপুরের নায়েব বাড়ি, সিকদার বাড়ি, খালদার বাড়ি, আমানুল্লাহ হাওলাদার বাড়ির ইতিহাস ঐতিহ্য ছড়িয়ে আছে লোকের মুখে মুখে। ভাঙনের আতঙ্কে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। সবকিছু হারিয়ে যেন আজ অনেকেই পথে বসেছে।
স্থানীয় শিক্ষক আব্দুর রব হেলাল বলেন, এই গ্রাম থেকে একজন এভারেস্ট জয়ী জন্ম নিয়েছেন-এটাই আমাদের গর্ব। কিন্তু ভাঙনের কারণে সেই ইতিহাস হয়তো নদীর গর্ভেই হারিয়ে যাবে। এই তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে কুতুবা ইউনিয়নের দুইটি ওয়ার্ডের অনেক অংশ। বিশেষ করে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন হযরত মাওলানা আব্দুল হাই শরিফ সাহেবের ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছোট মানিকা ফাজিল মাদ্রাসা আজ হুমকির মুখে।
মাদ্রাসার বর্তমান অধ্যক্ষ মোঃ ছাইফুল্লাহ বলেন, অতি দ্রুত ভাঙ্গন রোধে ব্লক নির্মাণ করা না গেলে ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যের ধারক প্রাচীন এই বিদ্যাপিঠটি রক্ষা করা সম্ভব হবে না। এছাড়া এখানেই শুয়ে আছেন এই উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন হযরত মাওলানা আব্দুল হাই শরিফ সাহেব। তাই তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গন থেকে রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানাচ্ছি।
ইকোপার্কের স্বপ্ন ভাঙন : ২০১৬ সালে তেতুলিয়া নদীর কোল ঘেঁষে গঙ্গাপুরে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘তেঁতুলিয়া রিভার ইকোপার্ক’। এটি একসময় ছিল শত শত পর্যটকের ভিড়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পার্কটি আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। যে বেঞ্চে বসে তরুণরা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করত, এখন সেটা পরিত্যক্ত। স্থানীয় হাওলাদার বাড়ির বাসিন্দা আঃ কাদের দুলাল হাওলাদার (৫৭) এই ইকোপার্কটি রক্ষনাবেক্ষন ও পুনরায় চালু করার দাবি জানান।
মানুষের আর্তনাদ : মাছধরা নৌকার মাঝি মোঃ মামুন (৩২) বলেন, নদী আমাদের রিজিকের মাধ্যম বটে, আবার কাঁদায়ও। প্রতিদিন ভাঙনের খবর শুনি, কে জানে আগামীকাল কার ঘর ভেসে যাবে। অন্যদিকে তরুণরা মনে করেন, নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ ও ইকোপার্ক সংস্কার হলে এলাকাটি আবারও পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

সম্ভাবনার আলো : স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন বলছেন, সরকারের উদ্যোগ ও বরাদ্দ পেলে নদীর ভাঙন রোধ ও পর্যটন উন্নয়ন সম্ভব। এতে কর্মসংস্থান তৈরি হবে, আর এভারেস্ট জয়ী’র গ্রাম হয়ে উঠবে জাতীয় গর্বের স্মারক।
এখানেই জন্মেছিলেন এভারেস্ট জয়ী মুহাম্মদ আবদুল মুহিত। আর নদীর ভাঙ্গন রোধ হলে টিকে যাবে প্রায় শতবর্ষি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছোট মানিকা ফাজিল মাদ্রাসা। কিন্তু তেঁতুলিয়ার অবিরাম ভাঙন গ্রাস করছে সেই স্মৃতি, সেই ইতিহাস। তেতুলিয়া নদীকে রক্ষা করা গেলে বোরহানউদ্দিন উপজেলার গঙ্গাপুর কুতুবা ইউনিয়ন নয়-বাংলাদেশের এক টুকরো গৌরবই টিকে যাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
