ঘাট ইজারাদারের অপকর্মের বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএ’র সাড়াশী অভিযান
ভোলায় স্পীডবোটে বাড়তি ভাড়া আদায়

আল-আমিন শাহরিয়ার ॥ ভোলায় স্পীডবোট যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং লঞ্চঘাটে ইজারাদারের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযান শুরু করেছে বাংলাদেশ আভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। বিশেষ করে ভোলা-বরিশাল ও ভোলা-লাহার হাট নৌ পথে অসাধু স্পীডবোট মালিকরা সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে দীর্ঘবছর যাবৎ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতো। বিগত ফ্যাসিষ্ট জমানায় মনগড়া এমন ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারতোনা।
ভোলার ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট এলাকার শ্রেনীপেশার মানুষ ও বেশ কয়েকজন লঞ্চ মালিকের সাথে কথা হয়। তারা জানান, বিগত আওয়ামী স্বৈরশাসনামলে ভোলা জেলা আ’লীগ যুগ্ম সম্পাদক জহুরুল ইসলাম নকীবের কব্জায় ছিল সেখানকার লঞ্চ ও স্পীডবোট ঘাটগুলো। নকীবের একক আধিপত্য আর নির্দেশনায় ভোলা-বরিশাল, ভোলা-লাহারহাট নৌ-রুটে স্পীডবোটগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে চালানো হতো। তখন জোড়ের মুল্লুকে প্রতিবাদের কেউ ছিলনা। জুলাই-২৪ বিপ্লবের পর ভোলাবাসী যখন ভেবেছিলো যে, এবার হয়তো যাত্রী হয়রানী আর ভাড়া নৈরাজ্যের সেই কলঙ্কিত দৃশ্যপট পাল্টাবে। শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরবে নৌপথে। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে,ভাড়া সন্ত্রাস আর যাত্রী নিপীড়নের খড়গ যেনো আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্বৈরজমানার সেই পুরনো নৈরাজ্য আর সন্ত্রাসলীলা নতুন মোড়কে শুরু করেছে দূর্বৃত্তচক্র।
এদিকে এহেন পরিস্থিতিতে যাত্রী হয়রানী, অধিক ভাড়া আদায় এবং চাঁদাবাজীর বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাথে নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে সাড়াশী অভিযান শুরু করায় ভেদুরিয়া ঘাটের দূর্বৃত্তদের শরীরে জ্বালা ধরা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ভেদুরিয়া লঞ্চঘাটে অভিযান চালিয়ে নৌবাহিনী ইজারাদারের নিয়োজিত দুই চাঁদাবাজকে আটক করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে স্পীডবোটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও লঞ্চঘাটের সন্ত্রাস আর দৌরাত্ম দমনে বিআইডব্লিউটিএর প্রতি সাধারণ মানুষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে গেলে বরিশাল থেকে লঞ্চযোগে ভোলায় আসা যাত্রী তাওহীদ, সুলতান আহম্মেদ, আবুল কালাম ও ডা. মাহবুব আলমের সাথে কথা হয়। তারা সকলেই একবাক্যে বলেন, ভেদুরিয়া ঘাটে ইজারাদার ও স্পীডবোট মালিকরা নতুন মোড়কে পুরনো ভাড়া সন্ত্রাস আর নিপীড়নের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। অসাধু স্পীডবোট মালিকচক্র ও ইজারাদার সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে ভোলা-বরিশাল ও ভোলা-লাহার হাট নৌরুটে অস্বাভাবিক ভাড়া আদায় করছে। ভোলার বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর কর্মকর্তা রিয়াদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, ভেদুরিয়া-বরিশাল নৌ-পথে সরকার নির্ধারিত স্পিডবোট ভাড়া-২৮ এপ্রিল ২০২৫ইং আরিখ হতে জনপ্রতি ৩শ’ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
ভেদুরিয়া-লাহারহাট নৌ-পথে একই গেজেট মূলে ১৫০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। ইতিপূর্বে ভেদুরিয়া-বরিশাল নৌ-পথে ৩৫০ টাকা ও ভেদুরিয়া-লাহারহাট নৌ-পথে ২শ’ টাকা স্পিডবোট মালিক ও চালকগণ আদায় করলেও সরকার নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর হওয়ায় ইজারাদার (ভেদুরিয়া ঘাট) বার্নিং চার্জ সরকারী ৭৫ টাকার স্থলে ১৩ শ’ টাকা গ্রহণ করতো। কিন্তু সরকারের নির্ধারিত ভাড়া ঢালু হওয়ায় ৬শ’ টাকা গ্রহণে বাধ্য হয় তারা। তখন তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ স্পিডবোট মালিকদেরকে ১/২ জন অতিরিক্ত যাত্রী বহনে উৎসাহিত করে। যার ফলে ৩ থেকে ৬ শ’ টাকা অতিরিক্ত অর্জিত হয়। কিন্তু সার্ভে সনদে ৪০ হর্স পাওয়ার ইঞ্জিনের বোটে ৮ জন যাত্রী এবং ৫৫ হর্স পাওয়ার ইঞ্জিনের বোটে ১০ জন যাত্রী ধারন ক্ষমতা থাকে। ইজারাদার ৪০ হর্স পাওয়ার ইঞ্জিনের বোটে ৯/১০ জন যাত্রী নিয়ে যাতায়াত চালু করে। এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ বাঁধা দিলে তারা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিরুদ্ধে নানাধরণের অপপ্রচার ও অপতৎপরতা শুরু করে। বন্দর কর্মকর্তা তাদেরকে রুট পারমিটে কোন ধরনের খরচা নেই মর্মে বার বার বিয়ষটি নিশ্চিত করলেও তারা তাদের অপকর্ম চালাতে বিরত হচ্ছেনা। ফলে বিআইডব্লিউটিএ এসব অন্যায় তৎপরতার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় সাড়াশি অভিযান অব্যহত রেখেছেন বলে জানান ভোলা নৌ-বন্দরের এ কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভেদুরিয়া ঘাট ইজারাদার আব্দুর রহমান গংরা বার্নিং চার্জ ৭৫ টাকার স্থলে ৬শ’-টাকা থেকে ১হাজার টাকা, সময়ভেদে অনবরত গ্রহণ করতে থাকে। বিআইডব্লিউটিএ, কোষ্টগার্ড ও নৌ-বাহিনী এ বিষয়ে সোচ্চার হলে তারা কথায় কথায় ধর্মঘটের ডাক দিয়ে বিষয়টি পুনরায় বন্দর কর্মকর্তার ঘাড়ে দোষ চাপানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। এছাড়া ইজারাদার ঘাটে প্রবেশ সরকারি মূলা ৫ টাকার স্থলে ১০ টাকা গ্রহণসহ হাতে বহন যোগ্য মালামাল থেকে যাত্রীপ্রতি ৫শ’ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত জোড়পূর্বক আদায় করে থাকেন। ইজারাদারের বিরুদ্ধে এহেন বিস্তর অভিযোগের অন্ত নেই।
সূত্রমতে, একই ইজারাদার ভেদুরিয়া ফেরীঘাটে গত ২৭ জুলাই ২০২৫ ইং তারিখ সরকার নির্ধারিত গাড়ী পার্কিং ইয়ার্ড ও অতিরিক্ত চার্জ গ্রহণ করার অপরাধে ভ্রাম্যমান আদালতের বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট ৬০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেন। বর্তমানে ভোলার ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট ঘাটে ইজারাদার ও স্পীডবোট মালিক পক্ষ তাদের অন্যায় অপকর্ম স্বিকৃতি পাওয়ার দাবীতে ভোলা-বরিশাল নৌ-রুটে গত ৪/৫ দিন ধরে স্পীডবোট চলাচল বন্ধ রেখেছে। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত ঘাট ইজারাদার আব্দুর রহমান ও সংশ্লিষ্ট স্পীডবোট মালিকদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো অসত্য ও অবান্তর।
