পুঁজিবাদ

॥ এম আর আমিন ॥

পৃথিবীর মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ শোষক আর এক ভাগ শোষিত। স্বাধীনতা ও গনতন্ত্র মানুষের জন্মগত অধিকার। মানব সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সমাজ বিকাশের কয়েকটি পর্যায় লক্ষ্য করা যায়। সমাজ প্রধানত চারটি পর্যায় অতিক্রম করে বর্তমান অবস্থায় এসে পৌছেছে। ১। আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা ২। দাস সমাজ ব্যবস্থা। ৩। সামন্ত্রতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ৪। ধনতান্ত্রিক বা পুজিবাদী সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে । এছাড়া কোন কোন মানব সমাজে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে। বর্তমান আধুনিক পৃথিবীতে ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব প্রতিপত্তি ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে।
পুঁজিবাদী বা ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুজিপতি বা মালিক এবং শ্রমিকগন খেটে খাওয়া মানুষ এ দুটি শ্রেনীতে বিভক্ত দেখা যায়। এতে উৎপাদনের উপকরন সমূহ ধনিকশ্রেনীর মালিকানাধীন থাকে আর শ্রমিক শ্রেনী তাদের জীবিকার্জনের জন্য শ্রম বিক্রয় করে থাকে। এ সামাজিক অসমতার কারনে নিপীড়িত ও শোষিত জনগন মননশীল প্রতিভা বিকাশে অর্থনৈতিক সামাজিক ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে দেউলিয়া হয়ে যায়। বেচে থাকার তাগিদে শ্রমিক/মজুর শ্রেনী শ্রম বিক্রয় করে থাকে অত্যন্ত কমমূল্যে আর মালিকগন স্বপ্ল মূল্যে শ্রম কিনে অর্থের পাহাড় গড়ে তোলে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বুর্জোয়া শ্রেনী ও সর্বহারা শ্রেনী দুটি পরস্পর বিরোধী শ্রেনীর অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।
এ সমাজ ব্যবস্থায় বুর্জোয়া শ্রেনী দিন দিন ধনী থেকে অধিকতর ধনী হয়ে ওঠে। গরীবের রক্ত চুষে তারা কালো টাকার পাহাড় গড়ে তোলে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কোন নির্দিষ্ঠ ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনা। পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ও পরিবর্তন আনয়ন করে। পুঁজিপতিরা নিজেদের শ্রেনীস্বার্থ রক্ষাকল্পে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তারা এক প্রকার প্রচ্ছন্ন স্বৈরাচারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের শোষন অক্ষুন্ন রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ক্ষমতাসীন সরকার পুঁজি পতিদের ক্রীড়ানকে পরিনত হয়।
রাজনৈতিক স্বাধীনতার ধু¤্রজাল সৃষ্টি করে ক্ষমতাসীন সরকার পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষার্থে জাতীয় সম্পদের সুষম বন্টন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নটি উপক্ষো করে। গনতন্ত্রের আড়ালে বুর্জোয়া শ্রেনীর একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা পুঁজিপতিদের হাতে থাকে বলে রাজনৈতিক ক্ষমতাও তাদের হাতে কুক্ষিগত হয়।
আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতন্ত্র জনপ্রিয় একটি সরকার পদ্ধতি হলেও এ গনতন্ত্র সফল করে তুলতে হলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা একান্ত আবশ্যক। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ব্যতীত রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। কেননা অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি অতি অল্প মূল্যেই ধনিক শ্রেনীর নিকট বিক্রি হয়ে যায়। ফলে গনতন্ত্র পুঁজি পতিদের করায়ত্তে চলে যায়। সুতরাং গনতন্ত্রকে সার্থক করে তুলতে হলে জনগনের মধ্যে অর্থনৈতিক সমতা আনয়ন করতে হবে এবং জনগনের খাতে নূন্যতম জীবন রক্ষা করে বাচঁতে পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পাহাড় সমতুল্য ব্যবধান পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় গড়ে ওঠে। জাতীয় সম্পদের এক বিরাট অংশ পুঁজিপতিদের কুক্ষিগত হয়। সমাজের এক বিরাট জনগোষ্ঠী আর্থিক দেউলিয়ার জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। ধনিক বনিক শ্রেণীর সাথে নিন্মবিত্ত, গরীব শ্রমিক মজুরশ্রেণী সর্বক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে একটি আপোষ কামিতায় এসে সমস্ত শোষণ নির্যাতন মুখবুজে নীরবে সহ্য করে। সুদখোরদের অবৈধ কার্যকলাপে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এদেশের অনেকেই গ্রামীণ জীবনের সাথে অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। বুর্জোয়াদের পেটি বুর্জোয়াদের দ্বারা সমাজ নিয়ন্ত্রিত।
ধনিক শ্রেণী আর মজুর শ্রেণী ছাড়াও সমাজে আরো দুটি শ্রেনী বিদ্যমান। নিন্ম মধ্যবিত্ত শ্রেণী, মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এদের কোন কুল কিনারা নেই। পরিস্থিতির যাঁতাকলে এরাও নিস্পেসিত। এরা না পারে নিচে নামতে না পারে উপরে উঠতে। এদের ভাবমুর্তি বজায় রাখার জন্য এরা সবকিছু মুখ বুঝে সহ্য করে। ক্ষেত্র বিশেষে এদের সন্তানেরা খুব কষ্ট করে জীবন সংগ্রাম করে উপরে উঠতে হয় আর না হয় তলিয়ে যায়। এদের অনেক সুন্দর আশা, সুন্দর স্বপ্ন অপূর্নই থেকে যায়।
পুঁজিবাদী অর্থব্যস্থাপনায় সামাজিক অবস্থার ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করে। সমাজে অস্থিরতা, অসহায় বেকারত্ব, ছিন্নমুল মানুষের সংখ্যাধিক্য, বস্তির মানুষের সংখ্যা, দুস্থ অসহায় মানুষের সংখ্যা, পথকলি বা টোকাইর জীবন এটা কোন সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারেনা। ছোট ছোট শিশুদের ঝুকিপূর্ন কাজে শ্রমিক হিসেবে যেখানে প্রতিনিয়ত দেখা যায় সে সমাজ ও অর্থ ব্যবস্থার কথা কিভাবে বর্ননা কর যায় করবো ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিনা।

১১ এপ্রিল ২০২৩ বাংলাদেশ প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী পথশিশুদের মধ্যেও মেয়ের তুলনায় ছেলের সংখ্যা অনেক বেশি। এর মধ্যে ৮২ শতাংশ ছেলে ১৮ শতাংশ মেয়েশিশু রয়েছে। ফেরার মতো পরিবার নেই ১৫.৯ শতাংশ। পরিবার ফিরতে চায়না ৬৪ শতাংশ পথশিশু। মাদকাশক্ত ১২ শতাংশ। বিবিএস জরীপ ফলাফলে দেখা গেছে এই শিশুরা পারিবারিক ও সামাজিক বাধাসহ বিভিন্ন কারনে পথশিশু হতে বাধ্য রয়েছে। পথশিশুর ৩৭ শতাংশ ঘর ছাড়ে ক্ষুধা দারিদ্রতায়।
সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি না আসা পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও তাদের অধিকার বঞ্চিত থাকতে হয়। নিস্পেষনের নিষ্ঠুর যাঁতাকালে গরীব দু:খী মজলুম মানুষের করুন আর্তনাদ নিভৃতে আধাঁরে ঢেকে যায়। আর্ন্তজাতিক কুখ্যাত পুঁজিবাদের ছোবলে গরীর দিন দিন গরীব হতে থাকে। ভূখা নাংগা ভূমিহীন ক্ষেতমজুরের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে, ধনী আরো ধনী হতে থাকে। সমাজের কতিপয় মুষ্টিমেয় ধুরন্ধর লোক সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করে।
পুঁজিবাদ প্রতিদিন প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে। খাদ্য দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মজুদদারী, মুনাফাখোর, চোরাচালানী ও অসহায় বেকারত্ব ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা সমাজকে গ্রাস করে ফেলে। এমনকি সমাজের অনেক মানুষ অভাবগ্রস্ত হয়ে জঠর জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বিভিন্ন অপরাধের সংগে জড়িত হয়ে পড়ে। চুরি, ডাকাতি, লুটতরাজ, হাইজ্যাকিং, সন্ত্রাস এ সমস্ত অপরাধ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে। নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে নাযে এ দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধনতান্ত্রিক, উৎপাদন পদ্ধতি ও বিন্যাসের দিক থেকে ধনবাদী চরিত্রের। সামন্ত্রতান্ত্রিকতায় নতুন রুপ আমরা দেখতে পাই। জোতদার ইজারাদারদের নীপিড়নমূলক তৎপরতা গ্রাম বাংলার মারাত্বক অবস্থা ধারন করেছে।
বিদেশী সংস্কৃতির জোর অনুশীলন চলছে শহর গ্রাম ও বন্দরে। বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী কৃষির সাথে জড়িত। কৃষি শিল্প থেকে বেশির ভাগ আয় আসে সন্দেহীতভাবে। প্রবাসীদের রেমিটেন্স থেকে একটা অংশ যোগ হয় অর্থনীতিতে। তবে ধনতন্ত্রের ক্রমাগত বিকাশ হচ্ছে আশ্চর্যজনকভাবে। কৃষিতে ভূমিহীনদের সংস্থা বেড়েই চলছে। বাজারে পন্যমূল্যের কৃত্রিম সংকট, দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি, কালোবাজারী মজুদদারী বেড়েই চলেছে।

ফেসবুকে লাইক দিন

আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।